কৃষিবিদরা জানান, নেপিয়ার ঘাস হল পূর্ব আফ্রিকার দুগ্ধ চাষিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পশু খাদ্য। বিশেষ করে গরু ও মহিষের জন্য। এটির কোন বীজ হয় না। কাটিং রোপণ করতে হয়। এর এক একটি ঝোপা বিশাল বড় আকারের হয়ে থাকে। এটির চাষ করতে একটি কাটিং থেকে আরেকটির দূরত্ব দিতে হয় দুই ফিট পর পর। দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে ফসল কাটা যায়। প্রতি একরে ফলন হয়ে থাকে ৬০ টন পর্যন্ত। এ খাস এক প্রকার স্থায়ী ফসল। এটি দেখতে অনেকটা আখের মত। লম্বায় প্রায় ৬ থেকে ১৩ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। এ ঘাস দ্রুত বর্ধনশীল, সহজে জন্মে, পুষ্টিকর, সহজপাচ্য ও খরা সহিষ্ণু। এ ঘাস একবার রোপণ করলে তিন থেকে ৬ বছর পর্যন্ত এর ফলন পাওয়া যায়। এটির চাষ বলা চলে সারা বছর করা যায়। উঁচু, ঢালু, অনাবাদি জমি যেমন বাড়ির পাশে, নদীর তীরে, পুকুর পাড়ে, রাস্তার ধারে এবং বেরীবাঁধ এলাকা ছাড়াও সমতলে এটির চাষ হয়ে থাকে। পাশাপাশি এ খাদ্যের প্রচুর চাহিদা থাকায় এ ঘাস চাষে ঝুঁকে পড়েছে অনেকে। নীলফামারী জেলার প্রায় প্রত্যেক পরিবার পশু পালন করে থাকে। তার মধ্যে গরু পালনের পরিবার বেশি। কেউ কেউ এখন খামার করে গরু পালন করছে। এক একটি খামারে নিম্নে ৫০ থেকে শতাধিকেরও বেশি গরু পালন করা হয়। আগে গরুর খাদ্য ছিল ভূষি, চালের গুড়া, পাতারের খাস,
খর, ভাতের মার, বাঁশের পাতা, ছোলাসহ আরও অনেক কিছু। বর্তমানে ওই সকল খাদ্যের দাম বেড়ে দ্বিগুন থেকে চারগুন হয়েছে। পাতারে এখন বিভিন্ন ফসল চাষাবাদ হচ্ছে। ফলে কোন জমি আর অযথা পড়ে থাকে না। তাই ঘাস মেলে না। এখন যারা গরু ছাগল পালন করে থাকেন তারা নিজ বাসাতেই সেগুলোকে বড় করে তোলেন। গরু পালন করতে এখন আর রাখালের প্রয়োজন হয় না। তবে বাসায় গরু দেখাশোনার জন্য লোকের প্রয়োজন হয়। গবাদি পশু পালন বৃদ্ধি পাওয়ায় নেপিয়ার ঘাস এখন অন্যতম অর্থকরি ফসল হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। লাভজনক হওয়ায় পশু পালনের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে নেপিয়ার ঘাস। গো-খামারে ব্যবহৃত ছোলা, ভুট্টা, গম, ভুষি, ফিড ও খড়ের দাম বৃদ্ধি হাওয়ায় প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকেরা শাক সবজি চাষের পরিবর্তে এখন ঘাস চাষের দিকেই ঝুঁকছে বেশি। কারণ হিসাবে জানা গেছে, ঘাস চাষে ব্যয় কম, উৎপাদন হয় সারা বছর। অন্য ফসলের তুলনায় লাভ বেশি। নীলফামারী সদরের সংগলশী ইউনিয়নের চাষি আরিফ হোসেন জানায়, তিনি ১৬ বছর থেকে এ ঘাসের চাষ করে আসছেন।
এতে কোন লোকসান নেই বরং লাভের পরিমান তিনগুন থাকে। বিক্রি করতেও তেমন অসুবিধা হয় না। সৈয়দপুর পৌর এলাকার কাজী পাড়ার মো. মিন্টু জানান, তিনি ১৫ বছর থেকে নেপিয়ার ঘাস চাষ করে আসছেন। এ বছর ৮ বিঘা জমিতে ঘাস চাষ করেছেন। ফলন বেশ ভাল হয়েছে। প্রতি বিখা জমিতে তার খরচ হয়েছে ১৫ হাজার টাকা। তিনি ঘাস বিক্রি করবেন ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। এতে তার লাভ হবে প্রায় দ্বিগুন। পাইকারি এবং খুচরায় বিক্রি করেন। এমন কথা জানালেন আরেক চাষি হুসাইন।
তিনি এবার আবাদ করেছেন তিন বিধা জমিতে। তিনিও ১০ বছর থেকে এ ঘাসের চাষ করে আসছেন। তিনি বছরে ৬ বার ঘাস কর্তন করেন বলে জানান। সৈয়দপুর উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়নে খামারি দুলাল হোসেন জানান, অন্যান্য খাদ্যের চেয়ে নেপিয়ার ঘাসের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় এ ঘাসকেই প্রধান গোখাদ্য হিসাবে তালিকায় রেখেছেন। এ ঘাস আসায় খামারে খরচ অনেক কমে গেছে। কামারপুকুর ইউনিয়নের খামারি হাজী শাহিবুল ইসলাম জানান, দিন দিন এ ঘাসের চাহিদা বাড়ছে। এর চাষও হচ্ছে প্রচুর। এমন এক সময় আসবে সেদিন নেপিয়ার ঘাস হবে দেশের প্রধান একটি অর্থকরি ফসল। সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি অফিসার ধীমান ভুষন জানায় এবার উপজেলায় সাড়ে ৭ হেক্টর জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষ হয়েছে। দিন দিন এ ঘাসের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। খামারিদের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।