মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে লক্ষ্ণীপুর জেলা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দুটি পৃথক আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে প্রথম কমিটি স্থগিত বা বাতিলের বিষয়ে কোনো লিখিত নোটিশ প্রকাশ না হওয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে বিভ্রান্তি, ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন। বুধবার সারাদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা চলতে থাকে । এর আগে মঙ্গলবার (১২ মে) সকাল সোয়া ৮টার দিকে এনসিপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট নতুন জেলা আহ্বায়ক কমিটির তালিকা প্রকাশ করা হয়।
এছাড়া গত ২৯ এপ্রিলও আরেকটি অনুমোদিত কমিটি প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকাশের মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে সেটি ফেসবুক পেজ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। যদিও সেই কমিটি বাতিল, স্থগিত বা বিলুপ্ত করার বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত ঘোষণা দেওয়া হয়নি।দুটি কমিটিই এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এবং দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ অনুমোদন দেন। প্রথম কমিটিতে মাছুম বিল্লাহকে আহ্বায়ক এবং আলমগীর হোসেনকে সদস্য সচিব হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিল। নতুন কমিটিতেও আহ্বায়কের দায়িত্বে রয়েছেন মাছুম বিল্লাহ। তবে সদস্য সচিব পদে পরিবর্তন এনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে অ্যাডভোকেট সামছুজ্জামান সোহেলকে।
নতুন ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে রাখা হয়েছে জাহাঙ্গীর আলমকে। যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন মামুন হোসেন, আব্দুর রহমান ভূঁইয়া, জিএম জাকারিয়া, আনোয়ার হোসেন ও মো. আলমগীর। সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব করা হয়েছে আলমগীর হোসাইনকে। যুগ্ম সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন মাহমুদুন্নবী টিটু, মোবারক হোসেন, ছফি উল্লাহ, মো. ইব্রাহিম খলিল, এম ফারভেজ, আনোয়ার হোসেন আরিফ, আনোয়ার হোসেন ও মীর মোহাম্মদ শুভ। সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ইউছুফ হাসান এবং সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন হানিফ মোহাম্মদ, আব্দুল আহাদ ফারাবি, রাসেদ হাসান ও আবুল হাসনাত সুমন। সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে জাফর আহমেদ ভূঁইয়া, আনোয়ার হোসেন, নাজমুল হাসান, সুমন হোসেন, আবু বকর, সাইফুল ইসলাম, ইব্রাহিম খলিল, আব্দুল কাদের, গাজী হুমায়ুন কবির, সুলতানা রাজিয়া, শারমিন আক্তার ও রিয়াজ উদ্দিন খানকে। প্রথম কমিটি হঠাৎ সরিয়ে নেওয়া এবং পরে নতুন কমিটি প্রকাশের ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন-যদি প্রথম কমিটি ভুল বা বিতর্কিত হয়ে থাকে, তবে তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত বা বাতিলের ঘোষণা কেন দেওয়া হলো না? আবার নতুন কমিটি ঘোষণার ক্ষেত্রেও মাঠপর্যায়ের মতামত যথাযথভাবে নেওয়া হয়েছে কি না, সে নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এদিকে নতুন কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব আলমগীর হোসাইন বলেন,“আমি ঘুমে ছিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি নতুন কমিটি। এটা অনেকটাই অসাংগঠনিক মনে হয়েছে। লক্ষ্ণীপুরের যারা কেন্দ্রীয় দায়িত্বে আছেন, তারা যদি মাঠপর্যায়ের খোঁজখবর নিয়ে কমিটি ঘোষণা দিতেন, তাহলে আরও ভালো হতো।
নতুন দলের ক্ষেত্রে শুরুতেই এ ধরনের পরিস্থিতি সাংগঠনিক সংকট তৈরি করে।”তিনি আরও বলেন, নতুন রাজনৈতিক দলের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু শুরুতেই যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্বচ্ছতা দেখা যায়, তাহলে কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। এ বিষয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠক আরমান হোসাইন বলেন, প্রথম কমিটি ঘোষণার পর কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়। স্থানীয়ভাবে আপত্তি ওঠে। পরে দ্রুত বিষয়টি পর্যালোচনা করে দুই ঘণ্টার মধ্যে ওই কমিটি স্থগিত করা হয়। এরপর সবার মতামত নিয়ে নতুন করে কমিটি প্রকাশ করা হয়েছে।” তিনি দাবি করেন, দলকে আরও সুসংগঠিত এবং গ্রহণযোগ্য করতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছে। মতবিরোধ সমাধান করেই নতুন কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় নেতাকর্মীদের একাংশ মনে করছেন, এ ঘটনা নতুন দলের সাংগঠনিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। তাদের ভাষ্য, দলীয় কাঠামো শক্তিশালী করতে হলে প্রথম থেকেই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, মতবিরোধ সমাধান করে নতুনভাবে কমিটি গঠন করাই রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয়।
বুধবার সারাদিন সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। কেউ এটিকে সাংগঠনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন-দল নতুন হওয়ায় এ ধরনের সমন্বয়হীনতা স্বাভাবিক, সময়ের সঙ্গে তা ঠিক হয়ে যাবে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির জন্য তৃণমূল পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর সে জন্য কমিটি গঠন, নেতৃত্ব নির্বাচন এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। পদ বঞ্চিতদের দাবী মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে দুটি কমিটি ঘোষণা এবং প্রথম কমিটি নিয়ে অস্পষ্ট অবস্থান-লক্ষ্ণীপুরে এনসিপির সাংগঠনিক কার্যক্রমকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, এই বিতর্ক কাটিয়ে দল কত দ্রুত সাংগঠনিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে।