“আমি শুধু আমার কাজটুকু করে যেতে চাই” সফল সংগঠক মাজারুল রুবেল

এফএনএস (বরিশাল প্রতিবেদক) : | প্রকাশ: ১৮ মে, ২০২৬, ১১:৫১ এএম
“আমি শুধু আমার কাজটুকু করে যেতে চাই” সফল সংগঠক মাজারুল রুবেল

বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের এক প্রান্তরে ছোট্ট একটি গ্রামের নাম চেংগুটিয়া। করোনার অন্ধকার সময়ে এখান থেকেই আলো জ্বালানোর কাজ শুরু করেছিলেন ওই গ্রামের বাসিন্দা সৈয়দ মোস্তফা ও পারভীন বেগম দম্পত্তির ছেলে সৈয়দ মাজারুল ইসলাম রুবেল।

গ্রামের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছা থেকে প্রতিষ্ঠা করেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন “একঝাক মানবিক মানুষ”। ২০১৯ সালে করোনার মহাবিপর্যয়ের সময় মাজারুল ইসলাম রুবেল চেংগুটিয়া যুব সমাজের ব্যানারে মানবিক কার্যক্রম শুরু করেন। ২০২৩ সাল থেকে সেই কার্যক্রম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন “একঝাক মানবিক মানুষ”র মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ধর্ম, বর্ণ, দলমত নির্বিশেষে কৃষক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক সবাই আজ এই সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবী।

করোনা থেকে শুরু, থামেনি আজও। করোনাকালে মাজারুলের নেতৃত্বে সংগঠনটি জনসচেতনতা, মাস্ক-স্যানিটাইজার বিতরণ, সামাজিক দূরত্বের আহবান জানিয়ে গ্রামে গ্রামে ছুটে চলেন। সংক্ষিপ্ত ভিডিও বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।

নাগরিক উদ্যোগে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ করে ১১টি পরিবারের জন্য নতুন ঘর, একটি মসজিদ নির্মাণ করেছে। তিনটি কন্যাদায়গ্রস্ত পরিবারের মেয়ের বিয়ে, অসংখ্য রোগীর চিকিৎসা সহায়তা, বেকার যুবককে ভ্যান কিনে দিয়ে কর্মসংস্থান, অসহায় প্রতিবন্ধীদের মাঝে হুইল চেয়ার বিতরণ, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা প্রদান, অসংখ্য ভাঙা ব্রিজ ও কালভার্ট মেরামত সবই হয়েছে এই সংগঠনের সদস্যদের হাত ধরে।

শীত মৌসুমে নিয়মিত শীতবস্ত্র বিতরণ, রমজানে ইফতার সামগ্রী বিতরণ, গ্রামীণ রাস্তা মেরামত, উন্মুক্ত পাঠাগার স্থাপন, চেংগুটিয়া বাজারে ঈদগাহ নির্মাণ, বর্ষায় বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিক বর্জ্যরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, অস্বাস্থ্যকর টয়লেট স্বাস্থ্য সম্মত করণের পাশাপাশি যুব সমাজকে সম্পৃক্ত করতে খেলাধুলার আয়োজন করে আসছে সংগঠনটি।

পরিবেশ আন্দোলনের অংশ হিসেবে মাজারুল ইসলাম রুবেল জনগুরুত্বপূর্ণ টরকী-বাশাইল খালটি দখলমুক্ত ও পুনঃখননের দাবিতে দীর্ঘদিন থেকে আন্দোলন করে আসছেন। এছাড়াও পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রীন ভয়েস, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইউনিটি ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশন, সালমা হোসেন কল্যাণ ট্রাস্ট, ঢাকাবাসী কল্যাণ সমিতি, নজরুল স্মৃতি সংঘের সাথে যৌথভাবে তিনি বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। এসব সংগঠনের কাজ দেখে এখন আশেপাশের গ্রামের তরুণ-যুবকরা অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেরাও সামাজিক কাজে যুক্ত হচ্ছেন। স্বেচ্ছাশ্রম বাদ দিয়েই প্রায় ৩০ লাখ টাকার অধিক কাজ করেছে অনিবন্ধিত এই সংগঠনটি। যা একটি বিরল দৃষ্টান্ত।

সৈয়দ মাজারুল ইসলাম রুবেল বলেন, কোনো কাজ শুরু করবার আগে আমরা স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে একটা সাধারণ সভা করি। সেখানেই কাজের ব্যয় নির্ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও পোস্ট করি এবং সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করি। বাজেট অনুযায়ী অর্থ সংগ্রহ হলেই আমরা ক্যাম্পেইন বন্ধ করে দেই। কোনো বাজেটে অর্থ ঘাটতি থাকলে স্বেচ্ছাসেবীরা নিজেদের ব্যক্তিগত অর্থ থেকে সেই ঘাটতি পূরণ করে থাকেন। যে কারণে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন করার জন্য কারো কোন সুযোগ থাকে না।

স্বেচ্ছাসেবী সাইদুল ইসলাম বলেন, “প্রতিটি কাজ শেষে মাজারুল ইসলাম রুবেল ভাই বলেন, এটাই শেষ আর করবো না। কিন্তু যখন কোনো মানুষ আবার অসহায়ত্বের কথা বলেন, তিনি আবার শুরু করে দেন। আমরাও একযোগে তার সাথে নেমে পরি।

স্বেচ্ছাসেবী আহাদ তালুকদার বলেন, ভার্সিটিতে পড়াশুনা করছি কিন্তু এখানে এসে বুঝেছি আসল শিক্ষা হয় মাঠে। মাজারুল ভাইয়ের সাথে কাজ করলে মনে হয় কিছু করতে পারছি। এটা বইয়ের পড়া না, মানুষের জন্য কাজ করা।

কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা সিদ্দিক সরদার বলেন, মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাতে পারছিলাম না। একঝাক মানবিক মানুষ না থাকলে মেয়েটার বিয়ে ভেঙে যেতো। ওনারা শুধু টাকা দেননি, সম্মানের সাথে পাশে দাঁড়িয়েছেন।

গৃহহীন রিপন হাওলাদার বলেন, আমার তিন সন্তান, মা আর স্ত্রীকে নিয়ে থাকার মতো ছাউনি ছিল না। একঝাক মানবিক মানুষ আমাদের জন্য ঘর করে দিয়েছে, উপার্জন করে খাওয়ার জন্য ভ্যান ক্রয় করে দিয়েছে। তাদের এই ঋণ আমি ও আমার পরিবার কোনোদিন শোধ করতে পারবো না।

কিডনি রোগে আক্রান্ত মওলানা মোশারেফ হোসেন বলেন, যখন চিকিৎসার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলাম। ঠিক তখনই খবর পেয়ে একঝাক মানবিক মানুষ পাশে দাঁড়িয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। অসুস্থ শরীরে এটাই এখন আমার বেঁচে থাকার শক্তি।

মাজারুল ইসলাম রুবেল স্কুল জীবন থেকেই উপস্থিত বক্তব্য, আবৃত্তি আর নাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। উপস্থাপক হিসেবেও তিনি ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছেন। ২০১০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত প্রথম আলো, শব্দনীড়, নক্ষত্র ব্লগে নিয়মিত সামাজিক বিষয় ও কবিতা লিখে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ২০১৭ ও ২০১৯ সালে প্রকাশ হয়েছে তার দুটি কাব্যগ্রন্থ।

শিক্ষাজীবন শেষে রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে ছিলেন প্রবাসে। দেশে ফিরে চাকরি করেছেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিরাক-বাংলাদেশে। স্কুল জীবন থেকেই স্কাউটের মাধ্যমে সামাজিক কাজের অনুপ্রেরণা পান। দায়িত্ব পালন করেছেন স্বনামধন্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন একরঙ্গা এক ঘুড়ি'র সদস্য সচিব হিসেবে।

বর্তমানে মাজারুল ইসলাম রুবেল জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল স্মার্ট সংবাদ এর ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি ও জাতীয় দৈনিক খোলা কাগজের আগৈলঝাড়া প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি পরিবেশবাদী সংগঠন ক্লাইমেট নেটওয়ার্ক'র ডিজিটাল মিডিয়া ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের সহযোগী সংগঠন সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি বাংলাদেশের বরিশাল জেলা উত্তর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন বন্ধ ও অধিকার আদায়ে স্বোচ্চার ভূমিকা পালন করছেন।

আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার লিখন বনিক বলেন, একঝাক মানবিক মানুষ সংগঠনটির কার্যক্রম সম্পর্কে আমি অবগত রয়েছি। তারা দুর্যোগ-দুর্বিপাকে মানুষের পাশে দাঁড়ায়। এ ধরনের স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ প্রশাসনের কাজকে সহজ করে।

ধানডোবা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক এইচএম মানিক হাসান বলেন, মাজারুল ছেলেবেলা থেকেই সামাজিক কাজে আগ্রহী। তার সংগঠন গ্রামের মানুষের জন্য নীরবে কাজ করে যাচ্ছে, যা প্রশংসার দাবি রাখে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল মানুষের জন্য কাজ করা। মাজারুল সেই চেতনাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তরুণ বয়সে যে স্বপ্ন নিয়ে দেশের জন্য যুদ্ধে গিয়েছিলাম, মাজারুলের মধ্যে আমি সেই দীপ্তি খুঁজে পাই।

সৈয়দ মাজারুল ইসলাম রুবেল বলেন, আমি শুধু আমার কাজটুকু করে যেতে চাই। আমার সংগঠনের সকল স্বেচ্ছাসেবীদের একটাই চাওয়া, কেবলমাত্র আল্লাহতালার সন্তুষ্টি লাভ করা। তিনি (মাজারুল) আরও বলেন, আমি একা কিছুই না। কৃতজ্ঞতা সেই মানুষগুলোর প্রতি যারা বরাবরই আমার গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগে শ্রম দিয়ে, অর্থ দিয়ে, পরামর্শ দিয়ে সাথে রয়েছেন। আমরা শুন্য হাতে নামি, মানুষের হাসি মুখ দেখে ঘরে ফিরি।

মাজারুল বলেন, আমাদের দেশ ছোট, সম্পদ কম। সরকারের পক্ষে সকল সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই ব্যক্তি উদ্যোগে, পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে মানুষের পাশে এগিয়ে আসলে অনেক সমস্যার সমাধান করা যায়। মানুষ হওয়ার দায় মেটানোর জন্য মানুষ তথা পরিবেশের পাশে দাঁড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে