নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে ভিটেমাটি, জিওব্যাগের ওপর সংসার

এফএনএস (বরিশাল প্রতিবেদক) : | প্রকাশ: ১৯ মে, ২০২৬, ০৬:১১ পিএম
নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে ভিটেমাটি, জিওব্যাগের ওপর সংসার

পঞ্চাশোর্ধ্ব নারী নুরজাহান বেগম। তিনি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন সন্ধ্যা নদীর মাঝ বরাবর। বিকেলের শেষ আলো নদীর ঢেউয়ে ওপর পরে ঝলমল করে ওঠে, সেই ঢেউয়ের দিকেই আনমনে চেয়ে থাকেন তিনি। যেন নদীর বুকেই খুঁজে ফেরেন হারিয়ে যাওয়া জীবনের স্মৃতি।

একসময় যে নদী তাদের জীবিকা, সুখ আর স্বপ্নের সঙ্গী ছিল, সেই নদীই আজ তাদের নিঃস্ব করেছে। চারবার ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে নুরজাহান বেগম ও হাবিবুর রহমান ফকির দম্পতির ৬৫ শতক জমি, বসতভিটা, গাছপালা আর সাজানো সংসার। এখন তাদের অস্থায়ী ঠিকানা নদীভাঙন ঠেকাতে সরকারিভাবে ফেলা জিওব্যাগের ওপর নির্মিত ছোট্ট টিনের ছাপড়ার ঘর।

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর নগর ইউনিয়নের রমজানকাঠী গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে এই দম্পতির অসহায় জীবনের বাস্তব চিত্র। রাজমিস্ত্রি হাবিবুর রহমান ফকির ও তার স্ত্রী নুরজাহান বেগম গত পাঁচ বছর ধরে জিওব্যাগের ওপর তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ ঘরেই বসবাস করছেন।

বর্ষাকালে ফুলে-ফেঁপে ওঠা সন্ধ্যা নদীর জোয়ারের পানি কখনও ঘরের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়, আবার কখনও ঢ়ুকে পরে ঘরের ভেতরে। ঝড়-বৃষ্টি বা বন্যা এলে তখন আশ্রয়ের জন্য ছুটতে হয় অন্যের বাড়িতে। তবুও তারা এই নদীপাড় ছেড়ে কোথাও যেতে পারেননি। কারণ এখানেই জড়িয়ে আছে তাদের শৈশব, সংসার, ভালোবাসা আর অসংখ্য স্মৃতি।

নুরজাহান বেগম বলেন, জীবনের কতো স্মৃতি জড়াইয়া আছে এই জায়গাডায়। একসময় জমিতে ফসল হইতো, সেই ফসল বিক্রি কইরা সংসার চলতো। স্বামীর ৬৫ শতক জমি ছিল, বাড়িঘর আছিল। সব নদী গিল্লা খাইছে। এখন বাকি শুধু আমরা দুইজন। অসহায় জীবনের মধ্যেও সুখ খুঁজি ওই নদীর দিকে তাকাইয়া।

কথা বলতে বলতে বারবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছিলেন তিনি। চোখে ছিল দীর্ঘদিনের না বলা কষ্টের ছাপ। তিনি আরও বলেন, না খাইয়া থাকলেও লজ্জায় কারও কাছে হাত পাতি না। আল্লাহ যেভাবে রাখছে, সেভাবেই ভালো আছি।

হাবিবুর রহমান ফকিরের কণ্ঠেও ছিল অসহায়ত্বের ভার। একসময় এলাকায় স্বচ্ছল মানুষ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন তিনি। রাজমিস্ত্রির কাজের পাশাপাশি জমির ফসলে চলতো তাদের সংসার। কিন্তু নদীভাঙনের একের পর এক আঘাতে সবকিছু বদলে যায়। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেইকা এইখানে বড় হইছি। অনেক জমি আছিল, বাপ-দাদার ভিটা আছিল। ভালোই জীবন চলতেছিল। সব কাইরা নিছে নদী। চারবার আমার ঘর নদীতে চইলা গেছে। সব নদীতে নিয়া যাওনের পর সরকার জিওব্যাগ ফেলছে। এখন ওই জিওব্যাগের ওপরই থাকি।

নদীভাঙনের দুশ্চিন্তা আর কষ্ট সহ্য করতে না পেরে তিনবার ব্রেইন স্ট্রোক করেছেন হাবিবুর রহমান। এখন কানে কম শোনেন। চলাফেরা করতে পারলেও আগের মতো ভারী কাজ করতে পারেন না। বয়স ও অসুস্থতায় আয়ও কমে গেছে অনেক। তাদের দুই ছেলে থাকলেও তারাও দিন আনে দিন খায়। বিয়ে করে পরিবার নিয়ে অন্যত্র ভাড়া বাসায় থাকেন। ফলে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়ানোর সামর্থ্য তাদের খুব বেশি নেই।

স্থানীয় বাসিন্দা ভাষাই মোল্লা বলেন, হাবিব ফকিরের বাড়ি চারবার নদীতে ভাঙছে। তার সব জমিজমা নদীগর্ভে গেছে। এখন তার নিজের কোনো জমি নাই, যেখানে ঘর তুলে থাকতে পারে। তাই জিওব্যাগের ওপর দোকানের মতো পাটাতন করে টিনের ছাপড়া দিয়ে দুইজন মানুষ বসবাস করতেছে। তিনি আরও বলেন, হাবিব ভাই আগের মতো কাজও করতে পারে না। খুব কষ্টে তাদের দিন চলে।

গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, সন্ধ্যা নদীর ভয়াল ভাঙনে এ অঞ্চলের অনেক পরিবারই নিঃস্ব হয়েছেন। কেউ অন্যত্র চলে গেলেও অনেকেই এখনও মায়ার টানে নদীপাড় ছাড়তে পারেননি।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান কামরুল আহসান খান হিমু বলেন, আমি এই এলাকার দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান। হাবিব ভাই আমাদের আত্মীয়, কিন্তু তার এই পরিণতি সম্পর্কে আমাকে জানায়নি। সাংবাদিকদের কাছ থেকে বিষয়টি জেনেছি। এটা আসলেই আমার জন্য লজ্জার। আমি এখান থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করি। মনে হয়নি ঘরটিতে কেউ বসবাস করে। যাইহোক, আমি চেষ্টা করবো উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে কথা বলে তাদের জন্য কিছু করার। এছাড়া সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা নিয়েও তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবো।

বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসমা উল হুসনা বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত মানবিক ও হৃদয়বিদারক। আমি স্থানীয় চেয়ারম্যানের সাথে হাবিব ও নুরজাহান দম্পতির অসহায় জীবনযাপনের বিষয়ে কথা বলেছি। আমরা পরিবারটির বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে সরকারি সহায়তার আওতায় আনার চেষ্টা করবো। পাশাপাশি নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য পরিবারগুলোর জন্যও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে