প্রকৃতিক দূর্যোগ, জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত অভিঘাত, লোনা পানির ধকল কিংবা মিঠা পানির তীব্র সংকট থেকে শুরু করে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতাই এঁদের আটকাতে পারেনি। জীবিকার চাকা সচল রাখতে কোমর সোজা করে কিংবা বুক চিতিয়ে লড়ছেন। প্রচন্ড উদ্যমি মন আর দৃঢ়চেতা মানসিকতা নিয়ে ১২টি মাস মাঠে, ক্ষেতে, আইলে কিংবা বাড়ি উঠোনে কৃষিকাজ করছেন। ধানসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির ফলন ঘরে তুলছেন। ১২ মাসের সবসময় বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফলের উৎপাদন করছেন। শুধু উৎপাদন নয় টনকে টন ফলন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করে দারিদ্র্য জয়ের যুদ্ধে জয়ী সৈনিক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অর্থনৈতি সাফল্যের পাশাপাশি নিজেদের উদ্যোক্তা হিসাবে তৈরি করেছেন। ১২ মাস ধরে কোন না কোন ফলন ঘরে তুলছেন। উফশী জাতের ধানের আবাদ করছেন। করছেন সবজির আবাদ। বাদ রাখেননি কোন ফলের উৎপাদন। গোলের গুড়, আম বাগান, বরই, ড্রাগন, ব্রকলি, বোম্বাই মরিচসহ বিচিত্র ধরনের ফল-ফলাদি উৎপাদন করে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছেন। বছর শেষে ঘরে তুলছেন লাখ লাখ টাকার পুঁজি। অন্যের জমি বন্দকী রাখা নিঃস্ব মানুষগুলো এখন হয়েছে জমির মালিক। যেন সবুজ বিপ্লবের সফল সেনাপতি। ২০-২৫ বছর আগের বেকার, হতদরিদ্র, হাইলা-কামলা মানুষগুলো আজকে নিজেদের পরিণত করেছেন গেরস্ত পরিবারে। শূন্য পূঁিজর অনেকেই যেন এখন লাখ টাকার নিচে গণতেই পারেন না। উদ্যমী মানুষগুলো এখন যেন সাফল্যের সিঁড়িতে দৌড়াচ্ছেন। সাগরপাড়ের দূর্যোগের গ্রাসে থাকা জনপদ পটুয়াখালীর কলাপাড়াকে কৃষি উৎপাদনের মডেলে পরিণত করা সফল মানুষগুলোর কথা বলছিলাম। আর এই সফল মানুষগুলোকে সম্মানিত করা হয়েছে। কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসনের এমন উদ্যোগে কর্মকর্তারাও যেন সম্মানিত হলেন। কৃষিক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা এই মাটির মানুষগুলোকে নিয়ে ব্যতিক্রমধর্মী এক আড্ডায় মেতেছিলেন সবাই। তারা শুনলেন শ্রেষ্ঠ ২০ কৃষি উদ্যোক্তার সফলতার গল্প । কৃষি উৎপাদনের অভাবনীয় সাফল্যের মধ্য দিয়ে কলাপাড়াকে কৃষি উৎপাদনের স্বর্গ রাজ্যে পরিণত করেছেন।
মঙ্গলবার বিকেলে আন্ধারমানিক নদী তীরের হেলিপ্যাড মাঠের সবুজ চত্বরে বসে এই ব্যতিক্রম আড্ডা হয়। যেখানটায় শুরুতেই ২০ ক্যাটাগরিতে সাফল্য বয়ে আনা শ্রেষ্ঠ ২০ জন কৃষি উৎপাদককে রজনিগন্ধা ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। যার যার পরিচয়ের ফেস্টুন হাতে ধরে অবস্থান করেন বিজয়ীর বেশে। বহুমুখী কৃষির স্বর্গরাজ্য-‘কলাপাড়ায় কৃষকের সাথে আড্ডা’ শীর্ষক এই ব্যতিক্রম ধর্মী আয়োজন করে কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি অধিদপ্তর কলাপাড়া। এখানে আগত সফল কৃষি উদ্যোক্তারা তাঁদের সাফল্যের কথাগুলো একেক করে বলেন। যেন মানুষগুলো তাঁদের জীবন থেকে দারিদ্র্য তাড়ানোর সফল একজন যোদ্ধার মতো বলেন কথাগুলো।
শ্রেষ্ঠ কৃষক সংগঠক কুমিরমারা গ্রামের সুলতান গাজী বলেন, ‘ খুলনা থেকে বীজ সংগ্রহ করে শুরু করেন কৃষি উৎপাদন। তাঁর গ্রামের অধিকাংশ মানুষ অন্যের বাড়িতে এক সময় কাজে থাকতেন। একমাত্র আমন ধানের উপর নির্ভর করতেন। আডার (আটা) জাউ মালৈ দিয়ে খাইতে অইছে। লোনা পানি ঠেকিয়ে, স্লুইজগেটে বাঁধ দিয়ে মিঠাপানি সংরক্ষণ করে আজ তাঁরা সবাই গেরস্ত পরিবার। জানালেন মাত্র চার শতক জমিতে বোম্বাই মরিচের আবাদ করে দেড় লাখ টাকা লাভ করেছেন। এখন আর গ্রামের কেউ বেকার নেই।’
শ্রেষ্ঠ নারী সংগঠক বিভা রাণী বিশ্বাস বলেন, ‘ এখন আমরা নারীরা পর্যন্ত বুঝতে পারছি যে রাসায়নিক সার দেওয়া সবজি খাওয়া বন্ধ করা প্রয়োজন। জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে হবে।’
শ্রেষ্ঠ উত্তম কৃষি চর্চার (গুড এগ্রিকালচার প্রাকটিস) মাধ্যমে সবজি উৎপাদক মো: মোস্তফা জামান বলেন, ‘ ২০১০ সালে সৌদি খেজুর উৎপাদনের মধ্য দিয়ে শুরু করেছি। অনেক লোকসানের ধকলের পওে এখন সবশেষ এক একর জমিতে লাউয়ের আবাদ করেছি। ৫০ হাজার টাকা খরচ করে তিন লাখ ২০ হাজার টাকা বিক্রি করেছেন। অন্তত আট হাজার লাউ বিক্রি করেছেন। পৌনে তিন লাখ টাকা লাভ করেছেন।
লতিফপুর গ্রামের শ্রেষ্ঠ সূর্যমুখীর উৎপাদক রুস্তুম সরদার জানালেন, তিন একর জমিতে এ বছর সূর্যমুখীর আবাদ করেন। অন্তত তিন টন বীজ পেয়েছেন। অন্তত লাখ টাকা আয় ঘওে তুলেছেন।
ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনকারী মোসাম্মদ হাওয়া বেগম জানান, মাসে কমপক্ষে গড়ে দুইটন করে এই জৈব সার উৎপাদন করে বছরে দেড় লক্ষাধিক টাকা আয় করে আসছেন। সৌদি খেজুর উৎপাদনকারী প্রকৌশলী মোজাহেদুল ইসলাম রুবেল জানান, ১১টি জাতের অন্তত ৭০টি খেজুর গাছ রয়েছে তার। যা দিয়ে চারা ও উৎপাদিত খেজুর বিক্রি করে বছরে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা আয় করে আসছেন। এজন্য তাঁকে অনেক কষ্ট করতে হয়। লেগে থাকতে হয়। হাইব্রিড জাতের ধান আবাদ করা শ্রেষ্ঠ চাষী চালিতাবুনিয়া গ্রামের হারিসুর রহমান জানান, ৩০ একর জমিতে বছরে কমপক্ষে ৬৫ টন ধানের উৎপাদন করেন। বছরে গড়ে ছয়-সাত লাখ টাকা লাভ করেন। আগাম সবজির আবাদ করা তরুণ কৃষি উৎপাদক পাখিমারা গ্রামের রাকিবুল ইসলাম জানালেন, দুই একর জমিতে বছওে অন্তত পাঁচ টন সবজির উৎপাদন কওে আসছেন। বছওে অন্তত নয় লাখ টাকা আয় করছেন। এবছর কোরবানিতে অন্তত দুই টন শসা বিক্রির আশা করছেন এই সফল উৎপাদক। ড্রাগন ফল উৎপাদনকারী কৃষক সৌরভ বিশ্বাস জানালেন, ৬৬ শতকে ড্রাগণের আবাদ করে ফলন পায় বছওে অন্তত ৮ টন। তার গড়ে ছয় লাখ টাকা আয় হয়। ডিগ্রি তৃতীয় বর্ষেও এই শিক্ষার্থী আরো জানান, এমন কৌশল রপ্ত করেছেন যে শীতকালে আলোর স্বল্পতার কারণে রাতের বেলা ড্রাগন বাগানো বিদ্যুতের আলো জ্বালিয়ে রাখেন। এতে ফলন দ্রুত ও বেশি আসছে।
মুগ ডালের শ্রেষ্ঠ উৎপাদক কামাল হোসেন জানালেন, তিনি পাঁচ হেক্টর জমিতে বছরে কমপক্ষে সাত টন ডাল উৎপাদন করছেন। এবছর ডাল বিক্রি কওে অন্তত ছয় লাখ টাকার লাভ ঘরে তুলেছেন। মাশরুম উৎপাদনকারী সফল কৃষক সৌরভ সাহা জানান, দশ শতক জমিতেক মাশরুম উৎপাদন করছেন। কেবল শুরু করেছেন। তাতেও অন্তত ৬০ হাজার টাকা লাভ করেছেন। বোম্বাই মরিচের সফল উৎপাদক কুমিরমারার মুসা কাজী জানালেন, ৬০ শতক জমিতে উৎপাদিত মরিচ বিক্রি করে আড়াই লাখ টাকা ব্যবসা ঘরে তুলেছেন। অন্তত সাড়ে তিন লাখ টাকা বিক্রি করেছেন। যেখানে তার খরচ হয়েছে প্রায় এক লাখ টাকা। গোল গাছের গুড় উৎপাদনকারী কৃষক ইলিয়াস মুন্সি জানান, ৫০ শতক জমিতে শুরু করে এখন পরিধি বেড়েছে। এখন তার প্রায় পাঁচ হাজার গোল গাছ রয়েছে। পাঁচ শ’ গাছ থেকে গুড় উৎপাদন করতে পারছেন। তাতে বছরে তার আয় অন্তত চার লাখ টাকা।
বিচিত্র ধরনের সবজির শ্রেষ্ঠ উৎপাদক কুমিরমারা গ্রামের আবুল কালাম। ভূমিহীন ছিলেন। বন্দকী জমিতে আবাদ শুরু করেন। এখন আড়াই একর জমির মালিক। সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করেছেন। বিভিন্ন জাতের যেমন, ব্রকলি, রেড বিটরুট, চাইনিজ ক্যাবেজ, গাজর, ফুলকপি, বাধাকপিসহ ২০-২২ ধরনের সবজির উৎপাদন করেন। বছরে প্রায় আট লাখ টাকা আয় করেন।
নাচনাপাড়া গ্রামের শ্রেষ্ঠ ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদক চিন্ময় রয় জানান, ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন কওে তার এখন বছওে আয় অন্তত ২৫ লাখ টাকা। মাসে কম কওে ৩০ টন সার উৎপাদন করেন। অভাব আর দারিদ্র্য জয়ের এক বীর সেনানী এই চিন্ময় রয়। মুসুল্লিয়াবাদ গ্রামের বরই বাগান মালিক মিজানুর রহমান জানান, এখন তার বাগানে অন্তত ৪০০ বরই গাছ রয়েছে। যেখান থেকে বছওে আয় করেন গড়ে পাঁচ লাখ টাকা। দুই একর জমিতে এই বাগানটি তিনি করেন। শ্রেষ্ঠ আম বাগানী কৃষক মুসুল্লিয়াবাদ গ্রামের জাহাঙ্গীর মুসুল্লী জানালেন, তার বাগানের দেশি-বিদেশী প্রায় ৩০ জাতের আমের ফলন হয়। এসব জাতের দেখার মতো আম নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। জানান, ছয় একর জমিতে তিনি বাগান কওে বছওে কমপক্ষে সাত লাখ টাকা আয় করছেন। এখন গোটা গ্রামজুড়ে চারা বিক্রি করেন। উৎসাহ দেন অন্যকে আবাদের জন্য।
প্রায় তিন ঘন্টা ব্যাপী এই কৃষকদের আড্ডা পরিণত হয় উৎসবে। এমন উৎসাহ আর সম্মাননা পেয়ে কৃষকরা যেন আরও উদ্দীপনা নিয়ে রাতে বাড়ি ফেরেন। ব্যতিক্রমধর্মী এই কৃষকের সাথে আড্ডা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাউছার হামিদ বলেন, কলাপাড়া উপজেলার এই কৃষকরা কতটা লড়াই করে সকল ধরনের প্রাতকূল পরিবেশ মোকাবেলা করে নিজেদেরকে সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে পরিণত করেছেন। বিস্ময়কর এক জনপদে পরিণত করেছেন কলাপাড়াকে। কৃষি উৎপাদনের মধ্য দিয়ে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছেন। তারা একেকজন নিজের জন্য নয়, দেশের সকল মানুষের চাহিদা মেটাতে কাজ করছেন। কলাপাড়াকে কৃষি উৎপাদনের হাবে পরিণত করছেন। বিশেষ করে গোলের গুড়, কুমিরমারার সবজির আবাদ। আগাম সবজি আবাদেও কৌশল রপ্ত করেছেন। হাইব্রিড ধানের উৎপাদন করছেন। ভ্যরাইটিস জাতের শস্য উৎপাদন ভান্ডারে পরিণত করেছেন। তাদেরকে সরকারিভাবে সকল ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন এখানে আসা সুলতানেরা কলাপাড়া নয় এই বিভাগের গর্ব। কৃষির উন্নয়ন উৎপাদন যাদের নেশায় পরিণত হয়েছে। এরা সবুজ সেনানী।
এই অনুষ্ঠানে উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাজী হুমায়ুন সিকদার, উপজেলা কৃষি কর্মর্তা মোঃ আরাফাত হোসেন, পৌর বিএনপির সভাপতি গাজী মোঃ ফারুক, কলাপাড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি নেছারউদ্দিন আহমেদ টিপু বক্তব্য রাখেন। আর সফল শ্রেষ্ঠ কৃষি উৎপাদক শ্রেণির মানুষগুলো তাঁদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন।