সিলেট সীমান্তে গত ২৬ বছরে অন্তত চারবার ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফকে (বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স) কঠোর প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য করেছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী তৎকালীন বিডিআর (বর্তমান বিজিবি)। সীমান্তে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এসব ঘটনায় বাংলাদেশি বাহিনীর দৃঢ় অবস্থান, পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় মিলেছে বারবার।
সর্বশেষ এমন ঘটনা ঘটেছে সোমবার (১৮ মে) সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনার হাট সীমান্তে। এর আগে ২০০১ সালের পদুয়া সংঘর্ষ, ২০০৬ সালের বারঠাকুরী সীমান্ত সংঘর্ষ এবং ২০০৯ সালের ডিবির হাওর সংঘর্ষেও বাংলাদেশি বাহিনীর জোরালো প্রতিরোধের মুখে বিএসএফকে পিছিয়ে যেতে হয়েছে।
সোনার হাট সীমান্তে সর্বশেষ উত্তেজনা
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সোমবার বিকেলে গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনার হাট সীমান্ত এলাকায় কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই বিএসএফ সদস্যরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরের দিকে গুলি ছোড়ে। এ সময় বিজিবি সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা জবাব দেয় এবং সীমান্তজুড়ে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
বিজিবির দৃঢ় অবস্থানের মুখে একপর্যায়ে বিএসএফ সদস্যরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
বিজিবি সিলেট ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক বলেন, “বিজিবি অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। সীমান্ত এলাকায় টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক রয়েছে।”
২০০১ সালের পদুয়া সীমান্ত সংঘর্ষ
সিলেট সীমান্তের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়াবহ সংঘর্ষ ঘটে ২০০১ সালের ১৬ থেকে ২০ এপ্রিল গোয়াইনঘাট উপজেলার তামাবিল সীমান্তসংলগ্ন পদুয়া এলাকায়। ঘটনাটি ‘পদুয়া সীমান্ত সংঘর্ষ’ নামে পরিচিত।
তৎকালীন তথ্যনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে বিএসএফ নো-ম্যানস ল্যান্ডে পাকা রাস্তা নির্মাণের চেষ্টা চালায়। এর প্রতিবাদে ১৬ এপ্রিল রাতে বিডিআর সদস্যরা বিএসএফের একটি ক্যাম্প ঘেরাও করে এবং পুরো এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।
এরপর টানা কয়েকদিন উভয় বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি চলে। সংঘর্ষে বিএসএফের ১৬ সদস্য নিহত হয়। অন্যদিকে বিডিআরের ৩ সদস্য শহীদ হন।
সংঘর্ষের তীব্রতায় সীমান্ত এলাকায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও বিডিআরের শক্ত অবস্থানের মুখে বিএসএফ পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরে ২১ এপ্রিল দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
বারঠাকুরী সীমান্তে ১২ ঘণ্টার লড়াই
২০০৬ সালের ৯ আগস্ট রাত ১০টার দিকে জকিগঞ্জ উপজেলার বারঠাকুরী সীমান্তে আবারও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় ২৯৬ একর জমি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি কৃষকরা চাষাবাদ করে আসছিলেন। ওই জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে ভারতের হরিনগর ও চিন্নারখাল ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা অতর্কিত হামলা চালায়।
এ সময় বিডিআর সদস্যরা তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। উভয় পক্ষের মধ্যে প্রায় ১২ ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষ চলে। সংঘর্ষে বিএসএফ মেশিনগান ও মর্টার শেল ব্যবহার করে বলে অভিযোগ ওঠে।
ঘটনায় ২ জন বিডিআর সদস্য আহত হন। এছাড়া ৭ জন বাংলাদেশি বেসামরিক নাগরিকও আহত হন।
ভারতের আসাম রাজ্যের কাছাড় জেলায় দুই নারী বিডিআরের গুলিতে নিহত হয়েছেন বলে ভারতীয় কয়েকটি গণমাধ্যমে সে সময় খবর প্রকাশিত হয়।
পরদিন ১০ আগস্ট দুই দেশের কমান্ডার পর্যায়ের পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। তবে বাংলাদেশি বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূমি রক্ষা করতে সক্ষম হয়।
ডিবির হাওরে বিএসএফের ব্যার্থ দখলচেষ্টা
২০০৯ সালে জৈন্তাপুর উপজেলার ডিবির হাওর এলাকায় বিএসএফ আবারও বাংলাদেশি কৃষকদের চাষাবাদে বাধা দেয় এবং শাপলা বিলসংলগ্ন প্রায় ৮০ একর জমি দখলের চেষ্টা চালায়।
এ সময় বিডিআর সদস্যরা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে বিডিআরের পাল্টা অবস্থানের মুখে বিএসএফ সদস্যরা সরে যেতে বাধ্য হয়।
পরে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধান