জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ন্যায়সঙ্গত জ্বালানি রূপান্তরের পথ নিয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

প্রেস বিজ্ঞপ্তি | প্রকাশ: ২১ মে, ২০২৬, ১১:১৯ এএম
জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ন্যায়সঙ্গত জ্বালানি রূপান্তরের পথ নিয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা থেকে ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থায় উত্তরণের পথ খুঁজতে “From Santa Marta to Bangladesh: Assessing Pathways to Transitioning away From Fossil Fuels” শীর্ষক একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ, ব্রাইটার্স, ক্লাইমেট ফ্রন্টিয়ার, কাঠপেন্সিল, মিশন গ্রিন বাংলাদেশ, ওএবি ফাউন্ডেশন, ইউক্যান, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স, বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন, সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ এবং অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে আজ রাজধানীর সিরডাপ (CIRDAP)-এর এটিএম শামসুল হক অডিটোরিয়ামে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে কলম্বিয়ার সান্তা মার্তায় গত মাসের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত বৈশ্বিক জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তরণ সম্মেলনের অভিজ্ঞতা, গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এবং সম্মেলনের বিভিন্ন ফলাফল তুলে ধরে উপস্থাপনা প্রদান করেন কাঠপেন্সিল-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফারজানা ফারুক ঝুমু এবং ব্রাইটার্স সোসাইটির চেয়ার ফারিহা এস অমি। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোঃ জিয়াউল হক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল, ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) বাংলাদেশ-এর লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম এবং বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি বদরুল আলমসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোঃ জিয়াউল হক বলেন, সান্তা মার্তা সম্মেলনে বাংলাদেশের সরকারি অংশগ্রহণ দেশের জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি ইতিবাচক ও প্রগতিশীল অবস্থানকে তুলে ধরেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে আসন্ন জাতীয় বাজেটে উপযুক্ত প্রণোদনা, নেট মিটারিং কার্যকর বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। জিয়াউল হক আরও বলেন, তরুণদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ও নাগরিক সমাজের সক্রিয় ভূমিকা সরকারের নীতি বাস্তবায়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ন্যায়সঙ্গত উত্তরণের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে। সভাপতির বক্তব্যে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, জলবায়ু সংকট ও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা একটি আন্তঃসম্পর্কিত বৈশ্বিক সংকট, যা মোকাবিলায় সমন্বিত ও ন্যায়ভিত্তিক পদক্ষেপ জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, জাস্ট ট্রানজিশনকে কেবল প্রযুক্তিগত সমাধান হিসেবে দেখলে হবে না; বরং প্রাতিষ্ঠানিক, আর্থিক, আইনি, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাধা দূর করে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় নারী, যুব, শ্রমিক ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি জেন্ডার-রেসপনসিভ পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল তাঁর বক্তব্যে বলেন, সান্তা মার্তা সম্মেলন জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া, যা কপ প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতাকে পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। তিনি উল্লেখ করেন, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ন্যায়সঙ্গত উত্তরণ নিশ্চিত করতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং শ্রমিকসহ ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখনও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণ করছে, তাই বৈশ্বিক এই আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীফ জামিল আরও বলেন, সরকার, নাগরিক সমাজ, গবেষক ও তরুণদের সমন্বিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি অর্থবহ ও কার্যকর জ্বালানি রূপান্তর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, যাতে সান্তা মার্তা প্রক্রিয়ার সুপারিশগুলো আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়। তিনি আরও বলেন, সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের ওপর আরোপিত সকল ধরনের কর ও শুল্ক প্রত্যাহার করতে হবে, যাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ত্বরান্বিত হয় এবং সাধারণ মানুষের জন্য সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ব্যবহার আরও সহজ ও সাশ্রয়ী হয়। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) বাংলাদেশ-এর লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম তাঁর বক্তব্যে বলেন, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশে ভর্তুকির চাপ ও রাজস্ব ঘাটতি ক্রমাগত বাড়ছে, যা দেশের জ্বালানি খাতকে অর্থনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল করে তুলছে। তিনি আরও বলেন, প্রতি বছর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি ব্যয়ের পরিবর্তে এই অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করা হলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে এবং গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ ও উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি তাঁর বক্তব্যে বলেন, কলম্বিয়ার সান্তা মার্তা সম্মেলন জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ন্যায়সঙ্গত উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া, যা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে। কৃষকদের পক্ষ থেকে তিনি রাসায়নিক সার ও কীটনাশকনির্ভর প্রচলিত কৃষির পরিবর্তে অ্যাগ্রোইকোলজিক্যাল বা পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার ওপর জোর দেন। সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (C3ER), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, থেকে সাদিয়া জাহান রথি বলেন “সান্তা মার্তা সম্মেলন জলবায়ু প্রতিশ্রুতি থেকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার বাস্তবসম্মত পথের দিকে একটি পরিবর্তনের সূচনা করে। বাংলাদেশের জন্য এই রূপান্তরকে অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দ্বারা সমর্থিত হতে হবে।” 


বক্তারা বলেন, সান্তা মার্তায় অনুষ্ঠিত বৈশ্বিক জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তরণ সম্মেলন বিশ্বব্যাপী জ্বালানি রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ন্যায়সঙ্গত ও বাস্তবভিত্তিক নীতিমালা গ্রহণ এবং টেকসই জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখন জরুরি। তারা আরও বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উন্নয়ন কৃষি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে তরুণ সমাজ, গবেষক, নাগরিক সমাজ ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে আসন্ন COP31 সামনে রেখে বাংলাদেশকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করতে হবে।অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন একশনএইড বাংলাদেশের জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন টিমের ম্যানেজার এবং জেটনেট-বিডির সদস্য সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন ক্লাইমেট ফ্রন্টিয়ারের অপারেশন লিড, জুবায়ের ইসলাম। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন যুব সংগঠন, জলবায়ু কর্মী, গবেষক, কৃষক প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে