বাংলাদেশ যখন জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের দ্বৈত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন জ্বালানি খাতে বিদ্যমান কর ও শুল্ক কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির তুলনায় জীবাশ্ম জ্বালানিকে কর-সুবিধা দেওয়ার ফলে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি রূপান্তরের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর ওপর মোট করের হার মাত্র ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। বিপরীতে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর করের হার প্রায় ৩১ শতাংশ এবং বায়ুশক্তি সরঞ্জামের ওপর প্রায় ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ পরিবেশের জন্য তুলনামূলক ক্ষতিকর জীবাশ্ম জ্বালানি যেখানে কর-সুবিধা পাচ্ছে, সেখানে পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উচ্চ করের বোঝা বহন করছে। এই বাস্তবতা শুধু রাজস্ব নীতির অসামঞ্জস্যই নয়, বরং জাতীয় জ্বালানি নীতির সঙ্গে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্যও নির্দেশ করে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিসরে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে যদি সৌর ও বায়ুশক্তির সরঞ্জাম আমদানিতে উচ্চ কর আরোপ করা হয়, তাহলে এসব খাতে বিনিয়োগ ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হবেন এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রসার কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোবে না। অবশ্য করনীতি নির্ধারণে সরকারের সামনে রাজস্ব আহরণ, জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা এবং ভোক্তা স্বার্থ-এই তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। এলএনজির ওপর কর বৃদ্ধি করলে এর প্রভাব বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ও ভোক্তা পর্যায়ের দামের ওপরও পড়তে পারে। তাই যে কোনো পরিবর্তন হতে হবে ধাপে ধাপে, সুপরিকল্পিত এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে। তবে এতে সন্দেহ নেই যে, বর্তমান কর কাঠামো পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জামের ওপর অগ্রিম কর ও অন্যান্য শুল্ক কমানো, স্মার্ট গ্রিড ও সবুজ প্রযুক্তিতে প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং জীবাশ্ম জ্বালানির কর-সুবিধা যৌক্তিকীকরণের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে নীতিগত বার্তাও হতে হবে স্পষ্ট-পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিকে উৎসাহ এবং দূষণনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা। বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সবুজ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে আজকের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর। তাই কর কাঠামোয় ভারসাম্য ও দূরদর্শিতা এখন সময়ের দাবি।