কী বিষয়ে লিখব, তা চিন্তা করছিলাম। সকালের নাস্তা শেষে আজিজ আরিফিন জীম দরজা খুলে পেপার নিয়ে এসেছেন। সংবাদপত্র আমার হাতে দিয়ে বলল, “আব্বু, তোমার পেপার।” হাতে নিয়ে শিরোনামগুলো দেখছি। এ পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকে আমি সংশ্লিষ্ট, নিয়মিত পাঠকও বটে। পত্রিকার শিরোনামে দেখলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রপাতে একদিনে ৬ জন নিহত। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ, সদর ও নাচোল উপজেলায় পৃথক বজ্রপাতের ঘটনায় তিন নারীসহ ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
৪ জুন বৃহস্পতিবার বিকেলে ঝড়-বৃষ্টির সময় এসব দুর্ঘটনা ঘটে। একই সঙ্গে একটি গরুরও মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ নিশ্চিত করেছে। নিহতরা হলেন, সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের আতাহার এলাকার আব্দুল্লাহ (১৭), শিবগঞ্জ উপজেলার চকনরেন্দ্র গ্রামের মাহমুদা আক্তার (১৯), রানীবাড়ি গ্রামের সাদিয়া খাতুন (১৬), মোবারকপুর এলাকার মেসবাউল (১৪), নাচোল উপজেলার লাহাবাড়ি গ্রামের সুমিয়ারা বেগম (৪১) এবং গোসাইপুর গ্রামের হাসান আলী লালু (২১)।
পুলিশ জানায়, শিবগঞ্জে তিনজন কিশোরী ঝড়ের মধ্যে আমবাগানে আম কুড়াতে গেলে বজ্রপাতে প্রাণ হারায়। সদর উপজেলায় মাঠ থেকে গরু আনতে গিয়ে আব্দুল্লাহ আহত হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান। নাচোলে মাঠে ঘাস কেটে ফেরার পথে এবং আরেক এলাকায় পৃথক ঘটনায় দুইজনের মৃত্যু হয়। একদিনে তিন উপজেলায় ছয়জনের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সত্যি, নিউজটি সবাইকে হতবাক করেছে। তাই তো বিষয়টি নিয়ে লেখার জন্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করলাম।
আল্লাহর সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। যার জীবন আছে, তাকে এ সুন্দর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। এটাই আল্লাহর হুকুম।
কোনো দুর্ঘটনায় অকালে মানুষ যখন মারা যায়, তখন আশপাশের মানুষ সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য সহ্য করতে পারেন না। আর যে পরিবারের সদস্য মারা যান, সে পরিবারে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে বেশি বেশি তালগাছ রোপণের বিকল্প নেই।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় সর্বত্র অধিকহারে তালগাছ রোপণ এখন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বজ্রপাতের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, প্রতি বছর সারা বিশ্বে ২,০০০-২,৪০০ জন মানুষ বজ্রপাতের কারণে মারা যায় এবং ৫০ হাজারেরও অধিক মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হয়।
বাংলাদেশে ২০১৬ সালের মে মাসে মাত্র একদিনের ব্যবধানে ৮২ জনসহ সর্বমোট ৪৫০ মানুষের মৃত্যু বজ্রপাতের ভয়াবহতার চিত্র করুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। শুধু তাই নয়, ২০১৭ সালে বজ্রপাতের কারণে প্রায় ৩০৭ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটে, যা ২০১৫ সালের তুলনায় দ্বিগুণ। সরকারি তথ্যমতে, বজ্রপাতের কারণে প্রতিনিয়তই মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে। যেমন, ২০১৮ সালে বজ্রপাতের কারণে মৃত্যুর এ সংখ্যা ছিল ৩৫৯। বজ্রপাতের কারণে এই হতাহতের ঘটনা সবচেয়ে বেশি হচ্ছে হাওরাঞ্চলে।
বাংলাদেশে বজ্রপাতে নিহত-আহত ব্যক্তিদের সংখ্যা নিয়মিত নথিভুক্ত করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরাম (বিএফডিএফ)। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যে এক দিনে বজ্রপাতে বড় প্রাণহানির কয়েকটি ঘটনা পাওয়া গেছে। তাতে দেখা যায়, এক দিনে সর্বোচ্চসংখ্যক মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটেছে ২০১১ সালের ২৩ মে, ৫৮ জন। ২০১৬ সালের ১২ ও ১৩ মে দুই দিনে ৮৭ জন নিহত হয়েছিলেন। দুই দিনে ৩৩ জন নিহত হন ২০১৪ সালের ১৩ ও ১৪ আগস্ট।
এ ছাড়া ২০২১ সালের ৬ জুন ৩৭ জন, ২০১৩ সালের ৬ মে ৩৩ জন, ২০২৪ সালের ৪ জুন ২৯ জন, ২০১৮ সালের ১০ মে ২৯ জন, ২০২২ সালের ১৭ জুন ২৪ জন, ২০২৩ সালের ২৩ মে ২৩ জন, ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল ২২ জন, ২০১২ সালের ৬ এপ্রিল ২০ জন, ২০১৫ সালের ২ মে ১৯ জন, ২০১৭ সালের ৯ মে ১৬ জন, ২০১৯ সালের ৭ জুলাই ১৫ জন, ২০২৪ সালের ৬ মে ১৫ জন এবং ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল ১৪ জন নিহত হন বজ্রপাতে। এই তালিকা বলছে, বজ্রপাতের বড় ট্র্যাজেডি ঘুরেফিরে বছরের একই সময়ে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তালগাছে কার্বনের স্তর বেশি থাকায় তা বজ্রপাত নিরোধে সহায়তা করে। কারণ, তালগাছের বাকলে পুরু কার্বনের স্তর থাকে। তালগাছের উচ্চতা ও গঠনগত দিক থেকেও বজ্রপাত নিরোধে সহায়ক।
মাত্রাতিরিক্ত বজ্রপাতের কারণে মৃত্যুঝুঁকির কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে এবং এর প্রতিকারে করণীয় নির্ধারণে তৎপর হয়। বজ্রপাতের কারণে অতি উচ্চ ভোল্টেজসম্পন্ন বিদ্যুৎ সাধারণত ভূ-পৃষ্ঠের সবচেয়ে উঁচু স্থাপনা বা বস্তুতে আঘাত হানে। এজন্য পরিবেশবিজ্ঞানী ও আবহাওয়াবিদগণ পরিবেশ সুরক্ষায়, বিশেষ করে বজ্রপাতের হাত থেকে বাঁচার জন্য অধিকহারে তালগাছ রোপণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছেন।
তালগাছ সাধারণত ৩০ মিটার (৯৮ ফুট) পর্যন্ত লম্বা হয়। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি বজ্রপাতে সৃষ্ট অতি উচ্চ ভোল্টেজসম্পন্ন বিদ্যুৎ পরিবহন করে মাটিতে পৌঁছে দিয়ে বজ্রাঘাতের হাত থেকে রক্ষা করে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার ইতোমধ্যে সারা দেশব্যাপী কয়েক মিলিয়ন তালগাছ রোপণও করেছে। তাছাড়া, ভাঙন ও মাটি ক্ষয়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়ও তালগাছের জুড়ি মেলা ভার। তালগাছ গুচ্ছমূলীয় হওয়ার কারণে নদীর ভাঙন ও মাটির ক্ষয়রোধে এর রয়েছে বিরাট ভূমিকা।
তালের ইংরেজি নাম চধষসুৎধ চধষস। তালপঞ্চবিংশতি, অর্থাৎ পঁচিশ রকমের তাল আছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই ছড়াটি তোমরা কে না পড়েছ? মনে পড়ে-
“তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে,
সব গাছ ছাড়িয়ে,
উঁকি মারে আকাশে।”
পাবনার শাহজাদপুরে আসার সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রচুর তালগাছ দেখতেন, বিশেষ করে যখন পালকি করে আসতেন। তখন নাকি তিনি এই কবিতাটি লেখেন। আসলেই তালগাছের মতো লম্বা গাছ আর নেই। পাকা ফল ঢিপঢাপ করে গাছের তলায় পড়ে বলেই এর নাম তাল। তালের জন্ম মধ্য আফ্রিকায়। তোমরা কি জানো, মানুষের মতো তালগাছেরও মেয়ে গাছ আর ছেলে গাছ আছে? ছেলে গাছের মাথায় লম্বা লাঠির মতো জটা হয়, কোনো ফল হয় না; মেয়ে গাছে ফল হয়-অর্থাৎ তাল ধরে। এখন এসো, আমরা শুনি তালের যত কথা।
তালের রস : ছেলে গাছের লম্বা লাঠির মতো জটা কেটে কেটে তালের রস নামানো হয়। গরমকালে তালের রস হয়। তালের রস খুব মিষ্টি, বিশেষ করে রাতের বেলা খেতে খুব মজা লাগে।
তালের বড়া : ছোটবেলা থেকেই শুনছি, “তালের বড়া খাইয়া নন্দ নাচিতে লাগিল”। তালগোলা তেলে ভাজলে বড়া খুব মুখরোচক হয়।
তালগুড় : তালের রস জ্বাল দিলে হয় তালের গুড়। তালগুড় থেকে হয় তালের পাটালি।
তালমিছরি : তালের রস জ্বাল দিয়ে যেমন গুড় হয়, তেমনি বিশেষ পদ্ধতিতে এর গাদ বা ময়লা ফেলে দিয়ে স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো তালমিছরি তৈরি করা হয়। সর্দি-কাশি সারাতে তালমিছরি খুব উপকারী।
কচি তালের শাঁস : কচি অবস্থায় তাল ফলের ভেতরে যে বীজ হয়, তা থাকে খুব নরম। একে বলে তালশাঁস। গরমকালে কচি তালের শাঁস খেতে খুব মজা।
তালগোলা : কচি তালের রং সবুজ; কিন্তু পাকলে রং হয় কালো। ভাদ্র মাসে তাল পাকে। অন্য সময়ও কিছু তাল পাকতে দেখা যায়। সেগুলোকে বলে বারোমেসে তাল। কালো পাকা তাল থেকে সুঘ্রাণ বের হয়। পাকা তাল টিপ দিলে একটু নরম লাগে। মোটা প্লাস্টিকের মতো কালো খোসা টান দিলে উঠে আসে। ভেতরে পাটের আঁশের মতো কমলা রঙের তালের আঁশ ভর্তি থাকে তালগোলায়। আঁশ চিপলে সেই গোলা বের হয়। তালগোলা কাঁচা ও জ্বাল দিয়ে খাওয়া যায়।
তালপাটালি : ঘন তালগোলার সঙ্গে একটু পান খাওয়ার চুন মিশিয়ে একটা থালায় আধা ইঞ্চি পুরু করে ঢেলে রাখলে কিছুক্ষণের মধ্যেই তা জমে শক্ত হয়ে যায়। ঢালার সময় এর ওপর অল্প কিছু শুকনো চিঁড়া ছিটিয়ে দিলে তা খেতে সুস্বাদু হয় এবং চিঁড়া তালগোলার অতিরিক্ত জল শুষে পাটালিকে শক্ত করে। পাটালি চাকু দিয়ে বরফির মতো কেটে খাওয়া যায়।
তালের ফোঁপা : তাল থেকে গোলা বের করার পর বিচি বা আঁটি গাদা করে রেখে দেওয়া হয়। আশ্বিন-কার্তিক মাসে সেসব আঁটি থেকে গ্যাজ বা অঙ্কুর বের হয়। এরূপ বিচি দুই ফালা করে কাটলে ভেতরে নারিকেলের ফোঁপড়ার মতো তালের ফোঁপড়া পাওয়া যায়। চিবিয়ে খেতে তালের ফোঁপড়া বেশ মজা লাগে। বেগুনির মতো তালের ফোঁপড়া ও চালের গুঁড়ো জলে গুলে মাখিয়ে তেলে ভেজে খাওয়া যায়।
তালপিঠা : এক সময় গ্রামে গ্রামে ধুম পড়ত তালপিঠা বানানোর। তালের রস দিয়ে বানানো হতো মজার মজার পিঠা। কী নাম সেসব পিঠার-কানমুচড়ি, তেলপিঠা, পাতাপিঠা, তালমুঠা, তালবড়া, পাতাপোড়া ও তেলভাজা। আরও কত কী! ভাদ্র-আশ্বিন মাসে তাল দিয়ে পিঠা বানিয়ে আত্মীয়বাড়ি পাঠানোর রেওয়াজও ছিল।
তাল ক্ষীর : তালের গোলা, নারিকেল, গুড় ও দুধ দিয়ে জ্বাল দেওয়া হয়। একে বলে তাল ক্ষীর। তাল ক্ষীর দিয়ে মুড়ি বা রুটি খেতে খুব মজা লাগে।
তালসুপারি : পাকা তালের আঁটির ভেতর নারিকেলের মতো যে শাঁস হয়, তা কেউ কেউ শুকিয়ে কুচি কুচি করে কেটে পানের সঙ্গে সুপারির মতো খায়। একে বলে তালসুপারি। তবে তালসুপারি নামে আরও একটা গাছও কিন্তু আছে এ দেশে। এর ফলও সুপারির মতো, তবে অনেক ছোট।
তালের তেল : ফোঁপড়া তোলার পর আঁটির ভেতরে নারিকেলের মতো যে শক্ত শাঁস থাকে, তা তুলে রোদে শুকিয়ে ঘানিতে পিষে তেল বের করা যায়।
তালের ডোঙা বা নৌকা : এখনো গ্রামের অনেক মানুষ বিলে-ঝিলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য তালের ডোঙা নৌকার মতো ব্যবহার করে। তালগাছের গোড়ার লম্বা একটা খণ্ড দুই ফালি করে চিরে ভেতরের শাঁস তুলে খোলার মতো করে এই ডোঙা বানানো হয়। একটা তালগাছে দুটির বেশি ডোঙা বানানো যায় না।
তালপাখা : শহরে যারা বড় হয়েছে, তাদের অনেকেই হয়তো তালপাখা দেখেনি। তালগাছের পাতা রোদে শুকিয়ে তারপর বানানো হয় পাখা। তীব্র গরমে তালপাখার শীতল বাতাসে প্রাণ জুড়ায় মানুষ। বাঁশের কাঠির ফ্রেমে তালপাতা মেলে দিয়ে বানানো হয় তালপাখা। একেকটি তালপাতায় চার থেকে পাঁচটি পাখা হয়। যেভাবে অব্যাহতভাবে লোডশেডিং চলছে, এখন মানুষের তালপাখাই একমাত্র ভরসা।
তালকাঠ : তালগাছের থামের মতো বয়স্ক কাণ্ড করাত দিয়ে চিরে তালকাঠ বানানো হয়। তালকাঠ খুব মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী। টিনের ঘর বানাতে রুয়ো-বাতা হিসেবে তালকাঠ ব্যবহার করা হয়।
তালপাতার ঘর : তালপাতা দিয়ে ঘরও বানানো যায়। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের গরিব মানুষ তালপাতা দিয়ে ঘর বানিয়ে থাকে। ঘরের ছাউনি, বেড়া-সবই তালপাতা দিয়ে হয়।
তালপাতার বাঁশি : সেই গানটা কি তোমরা শুনেছ? “আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি।” তালপাতা দিয়ে আসলে খুব সুন্দর বাঁশি বানানো যায়, আর সুর করে মুখে ফুঁ দিয়ে তা বাজানো যায়।
তালপাতার পুঁথি : এখন তোমরা যেমন কাগজে লেখো, প্রাচীনকালে সেরকম কাগজ ছিল না। কাগজ আবিষ্কারের আগে কয়েকটা তালপাতা বেঁধে খাতা বানানো হতো। তাতে কঞ্চির কলম দিয়ে লেখা হতো। এখনো অনেক জাদুঘরে তালপাতার পুঁথি সংরক্ষিত আছে।
তালের টুপি : তালের কাণ্ড জলে পচিয়ে এর ভেতর থেকে সেমাইয়ের মতো আঁশ তোলা হয়। সেসব আঁশ দিয়ে সুন্দর করে বুনে তালের টুপি, ঝুড়ি, সাজি ইত্যাদি বানানো হয়। বীরভূম বা বাঁকুড়াতে গেলে তোমরা এসব জিনিস দেখতে পারবে।
তাল নবমী : জন্মাষ্টমীর পরদিন নবমী তিথিকে বলা হয় তালনবমী তিথি। এ দিনটি হিন্দুধর্মাবলম্বীরা বিশেষভাবে উদযাপন করেন। বারুইরা তাঁদের পানের বরজে এ দিন পূজা দেন।
তালপুকুর : তালের প্রবাদ ও বাগধারাও আছে। কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে অনেক সময় বলে “তালপুকুর”। তাল শব্দটি বড় অর্থে ব্যবহৃত হয়। তার মানে তালপুকুর হবে বড় কোনো পুকুর বা দীঘি। কিন্তু বিদ্রূপ করে অনেক সময় বলা হয়, “ঘটি ডোবে না, আবার তার নাম তালপুকুর।”
তিল থেকে তাল : এর অর্থ সামান্য বিষয়কে বড় করে তোলা।
তালপাতার সিপাই : এর অর্থ রুগ্ন বা ছিপছিপে। কেউ রোগা হলে তাকে বলা হয় তালপাতার সিপাই।
তালগাছের আড়াই হাত : এর অর্থ কষ্টকর বা কঠিন কাজ। তালগাছে যারা ওঠে, তারা জানে এর মাথার আড়াই হাত ওঠা কত কষ্টকর।
তালকানা : এর অর্থ বেতাল হওয়া।
তালের গুণাগুণ : তাল অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। ফলে এটি ক্যানসার প্রতিরোধে সক্ষম। এছাড়াও স্মৃতিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে। কোষ্ঠকাঠিন্য ও অন্ত্রের রোগ ভালো করতে তাল ভালো ভূমিকা রাখে। তালে মজুত ভিটামিন বি নানা রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ফলে প্রচুর ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস আছে, যা দাঁত ও হাড়ের ক্ষয় প্রতিরোধে সহায়ক। গা বমিভাব দূর করতে পাকা তাল কার্যকর। যদি দীর্ঘদিনের কাশিতে ভোগেন, তাহলে তাল খেয়ে উপকার পাবেন। তালে রয়েছে ভিটামিন এ, বি ও সি, জিংক, পটাশিয়াম, আয়রন ও ক্যালসিয়ামসহ আরও অনেক খনিজ উপাদান। কাঁচা তালও অত্যন্ত পুষ্টিগুণসম্পন্ন। এতে ভিটামিন এ, সি, বি, কপার, আয়রন, পটাশিয়াম, ফসফরাস, জিংক, ফাইবার, ক্যালসিয়াম ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যৌগ রয়েছে। পুষ্টিগুণ ও পরিবেশ সুরক্ষায় তালগাছের জুড়ি নেই। বাংলাদেশের অত্যন্ত সুপরিচিত একটি ফলজ বৃক্ষ। এটি পাম গোত্রের অন্তর্গত একটি উদ্ভিদ। ভাদ্র মাসে পাকা তালের রস দিয়ে বিভিন্ন মুখরোচক পিঠা তৈরি আবহমান বাংলার চিরায়ত বৈশিষ্ট্য। তালগাছ থেকে উৎপন্ন কচি ও পাকা ফল, তালের রস ও গুড়, পাতা-সবই আমাদের জন্য উপকারী। কচি তালবীজ সাধারণত তালশাঁস নামে পরিচিত, যা বিভিন্ন প্রকার খনিজ উপাদান ও ভিটামিনে পরিপূর্ণ। মিষ্টি স্বাদের কচি তালের শাঁস শুধু খেতেই সুস্বাদু নয়, বরং পুষ্টিতেও ভরপুর। শরীরবৃত্তীয় কাজে অংশ নেওয়া এই তালশাঁসের পুষ্টিগুণের পরিমাণ সারণি দ্রষ্টব্য। এ সব পুষ্টি উপাদান আমাদের শরীরকে নানা রোগ থেকে রক্ষা করাসহ রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। যেমন, তালের শাঁসে প্রায় ৯৩% বিভিন্ন প্রকার ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ পানি ও প্রাকৃতিক জিলেটিন থাকে। জ্যৈষ্ঠ মাসের গরমে পরিশ্রান্ত কর্মজীবী মানুষেরা তালের শাঁস খেলে দেহকোষে অতিদ্রুত ইলেকট্রোলাইট ব্যালেন্সের মাধ্যমে শরীরে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং আমাদের শরীরকে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা করে প্রাকৃতিকভাবে ক্লান্তিহীন রাখে। এ কারণে তালের শাঁসকে অনেক পুষ্টিবিদ প্রাকৃতিক শীতলীকরকও বলে থাকেন। অতিরিক্ত রোদে ও গরমের কারণে ত্বকে বিভিন্ন র্যাশ বা অ্যালার্জি দেখা দিলে তালের শাঁস মুখে লাগাতে পারেন। তাছাড়া সানবার্ন থেকে মুক্তি পেতে তালের শাঁসের খোসা ব্যবহার করা যায়। কচি তালের শাঁসে থাকা ভিটামিন সি ও বি কমপ্লেক্স আপনার পানি পানের তৃপ্তি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়, বমিভাব দূর করে, খাওয়ার রুচি বাড়ায়। তাছাড়া লিভারজনিত বিভিন্ন সমস্যা দূর করতেও তালের শাঁস বেশ কার্যকর। তালের শাঁসের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স অনেক কম (৩৫%) হওয়ায় ডায়াবেটিস রোগীর জন্য এটি একটি চমকপ্রদ খাদ্য উপাদান। অতিরিক্ত ওজনের কারণে কী খাবেন এ নিয়ে যারা দুশ্চিন্তায় ভুগছেন, তারাও অনায়াসে খাদ্যতালিকায় তালের শাঁস রাখতে পারেন, কেননা এটি তুলনামূলক কম ক্যালরিযুক্ত একটি খাবার। তালের শাঁস অধিক আঁশসমৃদ্ধ হওয়ায় যারা কোষ্ঠকাঠিন্যসহ অন্যান্য পেটের পীড়ায় ভুগছেন, তালের শাঁস হতে পারে তাদের জন্য প্রকৃতি প্রদত্ত এক ঔষধ। এতে থাকা ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অন্যান্য খনিজ উপাদান হাড়ক্ষয়, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তস্বল্পতা ও ক্যানসারসহ নানাবিধ শারীরিক সমস্যায় বেশ উপকারী ভূমিকা পালন করে। খেজুর গুড়ের ন্যায় তালের রস জ্বাল দিয়ে তৈরিকৃত তালমিছরিও আমাদের দেশে অতি পরিচিত একটি খাদ্য উপকরণ, যা সাধারণত বিভিন্ন অসুখবিসুখে পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তালমিছরির গুণাগুণ বর্ণনা করতে গেলে প্রথমত এর পুষ্টিগুণ বিবেচনা করতে হয়। এতে রয়েছে ভিটামিন বি১, বি২, বি৩, বি৬, বি১২, ক্যালসিয়াম, আয়রন, জিঙ্ক ও ফসফরাস। সর্দি-কাশি, রক্তস্বল্পতা ও পেটের পীড়াসহ নানাবিধ রোগের চিকিৎসায় এটি বেশ কার্যকর। যাদের ঘন ঘন ঠান্ডা লাগার ভয় রয়েছে, বিশেষত কাশি, গলায় জমে থাকা কফ ও শ্লেষ্মা দূর করতে হালকা গরম পানিতে গোলমরিচ গুঁড়া ও তালমিছরি গুলে খাওয়ালে বেশ উপকার হয়। তাছাড়া তুলসী পাতার রসের সঙ্গে তালমিছরি গুলে খেলে পুরোনো সর্দি-কাশি অতি দ্রুত নিরাময় হয়। চিনির তুলনায় গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেশ কম হওয়ায় ডায়াবেটিক রোগীর পাশাপাশি সব বয়সের মানুষের জন্য চিনির বিকল্প হিসেবে এটি বেশ নিরাপদ। মিছরি ক্যালসিয়াম ও আয়রনসমৃদ্ধ হওয়ায় হাড়ক্ষয় ও রক্তস্বল্পতায় ভোগা রোগীরা খাদ্যতালিকায় মিছরি রাখতে পারেন। উচ্চ রক্তচাপের রোগীরাও অনায়াসে মিছরি খেতে পারেন, কেননা মিছরিতে রয়েছে অধিক পরিমাণে পটাশিয়াম এবং উচ্চ রক্তচাপের জন্য দায়ী সোডিয়াম প্রায় নেই বললেই চলে।
প্রতি বছরই এই সব অঞ্চলে রাস্তা ও বাঁধ পুনর্র্নিমাণের জন্য মোটা অঙ্কের রাজস্ব ব্যয় হয়। এ সমস্ত বন্যাপ্রবণ এলাকার রাস্তা ও বাঁধের দুই পাশে তালগাছ রোপণ করে ভাঙনের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। এ জন্য বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বজ্রপাত, বন্যাসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণের জন্য সরকারের পাশাপাশি সামাজিক ও ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগী হয়ে আমাদের সকলকে পরিবেশবান্ধব এই বৃক্ষ রোপণে সচেষ্ট হতে হবে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটছে। বাংলা ও বাঙালির জনপ্রিয় ফল তাল। ভাদ্র মাসের তাল না খেলে কালে ছাড়ে না-বাঙালি সমাজে এমন প্রবাদও রয়েছে। তালগাছের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে সারা দেশে রাস্তার দুই পাশে তালগাছের চারা-আঁটি রোপণের জন্য ২০১৭ সালে নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর কাবিখা-টিআর প্রকল্পের আওতায় তালগাছের চারা-আঁটি লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কৃষি বিভাগ ও কয়েকটি এনজিও তালগাছ রোপণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমান সরকারের উচিত বজ্রপাত থেকে রক্ষা করতে ব্যাপকহারে তালগাছ রোপণ করা।
লেখক : প্রধান শিক্ষক, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, গোদাগাড়ী উপজেলা শাখা