দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সিভিল রাইটস সোসাইটি (বিসিআরএস)। সংগঠনটির সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম কয়েক মাসে খুন, অপহরণ, ডাকাতি, ছিনতাই এবং নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ঘটেছে। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এক হাজারের বেশি খুন, শত শত অপহরণ ও ডাকাতির ঘটনা এবং বিপুলসংখ্যক নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা সমাজে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়িয়েছে। বিশেষ করে শিশু ধর্ষণের ঘটনা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। অপরাধের পরিসংখ্যান নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের তথ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট-অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত কিশোর গ্যাং, মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধ, চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এসব অপরাধ শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং নাগরিক আস্থার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক অপরাধের ঘটনাই নানা কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয় না। ফলে প্রকৃত পরিস্থিতি সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে। এই বাস্তবতা অপরাধ বিশ্লেষণ, প্রতিরোধ এবং বিচারিক কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তোলে। তাই শুধু অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, বরং তথ্য সংগ্রহ, অভিযোগ গ্রহণ এবং তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগের বিষয় উঠে এসেছে। সীমান্ত এলাকায় কথিত পুশইন বা অনিয়মিত অনুপ্রবেশের অভিযোগ শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সঙ্গেও সম্পর্কিত। এ ধরনের ইস্যুতে কূটনৈতিক সংলাপ, তথ্য যাচাই এবং দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে পরিস্থিতির ইতিবাচক দিকও বিবেচনায় নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক উদ্যোগ এবং বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানোর মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ ছাড়া অপরাধ প্রতিরোধের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন করা কঠিন। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। তাই অপরাধের ক্রমবর্ধমান প্রবণতাকে রাজনৈতিক বিতর্কের সীমায় আবদ্ধ না রেখে জাতীয় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে কার্যকর, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণই সময়ের দাবি।