টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় কক্সবাজারের চকরিয়া পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় পানি কিছুটা কমলেও দুর্ভোগ কমেনি। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে লাখো মানুষ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। অনেক বাড়িতে এখনো রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অসংখ্য পরিবার শুকনো খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত থাকায় ত্রাণ পৌঁছানো এবং জরুরি সেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তিন উপজেলার ২৫টি ইউনিয়ন এবং দুটি পৌরসভাসহ দুই লাখ মানুষ এখনও পানিবন্দী হয়ে আছে। চকরিয়া-পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার অভ্যন্তরীন সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
এদিকে, জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ শাখার তথ্যনুযায়ী জানা গেছে, কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার জন্য ১২০ মেট্রিক ট্রন চাল ও নগদ ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা জরুরি অনুদান দিয়েছেন। তারমধ্যে চকরিয়া উপজেলার জর্য ৫০ মেট্রিক টন চাল এবং নগদ ৫০ টাকা , পেকুয়া উপজেলার জন্য ৪০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ২ লাখ টাকা এবং মাতামুহুরী উপজেলার জন্য ৩০ মেট্রিক টন চাল ও ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। এদিকে, শনিবার সকালে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো.আব্দুল মান্নান চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তিনি কিছু এলাকা পায়ে হেঁটে ও নৌকায় চড়ে পানিবন্দী বানবাসী মানুষের খবরাখবর নেন। এসময় তিনি বানবাসী মানুষদের বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও ওষুধ সামগ্রী বিতরণ করেন।
তবে, বানবাসী মানুষের অভিযোগ বন্যায় পানিবন্দী দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে এখনও কোন সহযোগিতা পৌছেনি। সুষ্ঠু এবং সঠিক খবরাখবর নিয়ে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করার অনুরোধ জানান বানবাসী মানুষ। প্রশাসন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক ও সেচ্ছাসেবী সংগঠেনর পক্ষ থেকে শুকনো খাবার ও খিচুড়ি বিতরণ করা হচ্ছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানির কারণে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী এলাকার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে। এতে চরম দূর্ভোগে পড়ে তিন উপজেলার বানবাসী মানুষ। মাতামুহুরী নদী থেকে উপচে আসা ঢলের পানি প্রবাহিত হওয়ায় বসতঘরগুলো পানির নিচে তলিয়ে গেছে। নি:স্ব হয়ে গেছে অনেক পরিবার। চকরিয়া -পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় বেশ কয়েকটি বেঁড়িবাধ ভেঙ্গে গিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করেছে বন্যার পানি। চকরিয়ার কাকারা, সুরাজপুর-মানিকপুর, লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল, বরইতলী, হারবাং, চিরিঙ্গা, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, খুটাখালী এবং পেকুয়া পৌরসভা ও উপজেলার মেহেরনামা, উজানটিয়া, মগনামা, রাজাখালী, টৈটং, শিলখালী ও বারবাকিয়া ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার সাহারবিল, বদরখালী, কোণাখালী, ঢেমুশিয়া, পূর্ব বড় ভেওলা, পশ্চিম বড় ভেওলা এবং বিএমচর ইউনিয়নে এখনও পানিবন্দী হয়ে আছে লক্ষাধিক বানবাসী মানুষ।
কাকারা ইউনিয়নের বাসিন্দা সাংবাদিক এম.জাহেদ চৌধুরী জানান, আমাদের ইউনিয়নগুলো মাতামুহুরী নদীর সাথে লাগোয়া। এজন্য পাহাড় থেকে নেমে ঢলের পানি আগে আঘাত আনে এসব ইউনিয়নগুলোতে। এই দুই ইউনিয়নে অধিকাংশ ঘর পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। গত তিন ধরে তাদের রান্নার কাজও বন্ধ। শুধু শুকনো খাবার খেয়ে রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্যার পানি নামার সাথে সাথে বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি দেখা দিচ্ছে। এজন্য চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পক্ষ থেকে মেডিকেল টিম ঘটন করা হয়েছে। তারা বন্যা কবলিত এলাকায় গিয়ে চিৎিসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও প:প কর্মকর্তা ডা.মো.জয়নাল আবেদীন বলেন, টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার অধিকাংশ এলাকা বন্যা কবলিত। শুকবার রাত থেকে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। বন্যার পানি নামার পরপর বন্যা কবলিত মানুষ বিভিন্ন রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। এজন্য দুই উপজেলায় ৫৪টি মেডিকেল টিম ঘটন করা হয়েছে। তন্মধ্যে চকরিয়ায় ৩৩টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। এই মেডিকেল টিমে একজন উপ-সহকারি ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্য সহকারী, ইউএইসচিপি কাজ করছে। মাতামুহুরী উপজেলায় ২১টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। এসব টিমও একজন উপ-সহকারি, নার্স, স্বাস্থ্য সহকারী ও ইউএইসসিপিরা কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, বন্যায় কবলিত কোন ব্যক্তি যদি গুরুতর জখম বা সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয় সেজন্য চকরিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে র্যাপিড রেসপন্স টিম ঘটনা করা হয়েছে। তাই সাপে কাটা বা গুরুতর জখমিদের দ্রুত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলে আসার আহবান জানান তিনি। পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউ্এনও) রফিকুল ইসলাম জানান, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন সরজমিন পরিদর্শন করেছি। পানি কমতে শুরু করেছে। পানিবন্দী মানুষদের শুকনো খাবার ও রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হচ্চে। এছাড়া জেলা প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত ত্রাণ বানবাসী মানুষদেও মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, বৃষ্টি একটু কমে এসেছে। বন্যার পানিও নামতে শুরু করেছে। দুই উপজেলায় প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।
তিনি বলেন, শনিবার সকালে জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো.আব্দুল মান্নান স্যার চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা পরিদর্শন করেছেন। তিনি বন্যা কবলিতদের সাথে কথা বলেন এবং খোঁজখবর নেন। এছাড়াও শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দুই উপজেলার জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণ বন্যা কবলিতদের দেয়া হচ্ছে। বন্যা কবলিত বানবাসীদের শুকনো খাবার ও রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়াও বিশুদ্ধ পানি এবং ওষুধ দেয়া হচ্ছে। দেয় আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থানরতদের শুকনো খাবার দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বন্যা কবলিত বানবাসী মানুষদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বন্যার ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মহোদয়কে অবহিত করে ত্রাণ বরাদ্দ চেয়েছি।