সরকারের সরকার ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে বরাদ্দ কমাতে চাপ বাড়াচ্ছে আইএমএফ

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৯ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০০ এএম
সরকারের সরকার ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে বরাদ্দ কমাতে চাপ বাড়াচ্ছে আইএমএফ

ঋণ আলোচনায় দাতা সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সরকারের ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে বরাদ্দ কমাতে চাপ বাড়াচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই সংস্থাটি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে সরকারি ভর্তুকি ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার সুপারিশ করে আসছে। বর্তমানে সরকারের ভর্তুকি নীতি আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান আলোচনা ও ভবিষ্যৎ ঋণ কর্মসূচিতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়িয়েছে। ফলে আইএমএফের সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাতে নতুন করে ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য ঋণ কর্মসূচির আলোচনাও জটিল হয়ে উঠছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে চলতি অর্থবছরের বাজেটে এক লাখ ২৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যাআগের অর্থবছরে প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছিলো। এক বছরের ব্যবধানে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বেড়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারের ভর্তুকি সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করেছে। কৃষি ভর্তুকি ২৭ হাজার কোটি টাকা অপরিবর্তিত রাখা হলেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের উচ্চ ব্যয়, এলএনজি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি খাতের আর্থিক চাপ সামগ্রিক ভর্তুকি ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই ঢাকায় সফর করা আইএমএফ প্রতিনিধিদল সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে ভর্তুকি বাড়ানোর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সূত্র জানায়, নতুন বাজেটে ভর্তুকি বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে আইএমএফ পূর্ববর্তী সংস্কার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করেছে আইএমএফ। সংস্থাটি বাংলাদেশ যে কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার অন্যতম প্রধান উপাদান ছিল ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। যদিও বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের বিদ্যমান কর্মসূচির আওতায় রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো ও জ্বালানি খাতে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু আইএমএফের দৃষ্টিতে ভর্তুকি কমানো ওসব সংস্কারের কেন্দ্রীয় অংশ। সংস্থাটির যুক্তি দীর্ঘ মেয়াদে বড় আকারের সর্বজনীন ভর্তুকি বাজেট ঘাটতি বাড়ায় এবং সরকারি ঋণের চাপ বৃদ্ধি করে ও উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য অর্থের সংকট তৈরি করে।

সূত্র আরো জানায়, আইএমএফ মনে করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য ধাপে ধাপে বাস্তব ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হলে কমে আসবে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির প্রয়োজন। তাছাড়া সর্বজনীন ভর্তুকির পরিবর্তে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করলে সরকারি অর্থেরও আরো কার্যকর ব্যবহার হবে। তাতে সৃষ্টি হবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ভর্তুকি কমানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে দেশে মূল্যস্ফীতি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম অস্থির। এমন অবস্থায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির দাম বাড়ানো হলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। বেড়ে যেতে পারে কৃষি খাতের উৎপাদন ব্যয়। যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়াবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে হঠাৎ মূল্য সমন্বয় করলে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যেতে পারে। তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে রপ্তানিমুখী শিল্প, কৃষি এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী। সেজন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আপাতত ভর্তুকি বহাল রাখা ছাড়া সরকারের সামনে কার্যকর বিকল্প নেই।

এদিকে বর্তমান তিন বছরের ঋণ কর্মসূচির বিভিন্ন অসম্পূর্ণ শর্ত নিয়ে আইএমএফের সাথে আলোচনা চললেও একই সময় সরকার নতুন করে প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে দর-কষাকষি করছে। তবে নতুন কর্মসূচিতে যেতে হলে আগের সংস্কার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে সংস্থাটি। বিশেষ করে ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা এবং ব্যাংকিং খাত সংস্কারে অগ্রগতি না হলে নতুন কর্মসূচির অনুমোদন বিলম্বিত হতে পারে।

এদিকে আইএমএফের ভর্তুকি ও প্রণোদনা কমানোর বিষয়ে বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানান, বর্তমানে দেশের টেক্সটাইল ও স্পিনিং খাত কঠিন সময় পার করছে। এ অবস্থায় জ্বালানি ভর্তুকি কমিয়ে দাম বাড়ানো হলে উৎপাদন ব্যয় আরো বেড়ে যাবে। যা রপ্তানি খাতের জন্য নতুন চাপ তৈরি করবে।

অন্যদিকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ) জানান, শিল্প খাত এখনো উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপে রয়েছে। এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।