সাতক্ষীরায় আয়োজিত দশদিনব্যাপী বৃক্ষমেলায় দর্শনার্থী ও পরিবেশপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে স্থানীয় উদ্যোক্তা মোস্তাক আহমেদ সিদ্দিকীর প্রতিষ্ঠান ‘সিদ্দিকী’স গ্রীন টেকনোলজি’। অপচনশীল বর্জ্য থেকে সবুজ জ্বালানি ও বিশুদ্ধ পানির সমন্বিত নানা উদ্ভাবন নিয়ে মেলায় হাজির হয়েছেন এই প্রবীণ উদ্ভাবক।
পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ চিপসের প্যাকেট, মাল্টিলেয়ার পলিথিন, পৌরবর্জ্য, গৃহস্থালির পচনশীল আবর্জনা ও পোল্ট্রি লিটার প্রক্রিয়াজাত করে তিনি তৈরি করছেন বিকল্প সবুজ জ্বালানি ও রাসায়নিক সারমুক্ত বায়ো-চার। পাশাপাশি বায়োগ্যাস ও এলপিজি সাশ্রয়ী ‘হিট গার্ড’ বা ‘গ্যাস সেভার’সহ নানা পরিবেশবান্ধব রান্নার সরঞ্জাম মেলায় আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। দীর্ঘ তিন দশকের গবেষণায় মোস্তাক আহমেদ সিদ্দিকী পরিবেশ সুরক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সুপেয় পানির সংকট নিরসনে ১৭টিরও বেশি উদ্ভাবনী প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। ‘কমপ্লিট ক্লিন কুকিং সলিউশন’ প্রযুক্তির অংশ হিসেবে তাঁর উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবন হলো মিথেন নির্গমন রোধকারী ‘সবুজ বায়োচার চুল্লি’ এবং ‘কার্বন ট্রাপিং সবুজ চুলা’। সাধারণ চুলায় রান্নার সময় যে বিপুল পরিমাণ তাপ অপচয় ও ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়, তা রোধ করে এসব চুলা। ধোঁয়া ও কালি শোষণ করে বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি অবশিষ্টাংশ থেকে তৈরি করে মূল্যবান বায়ো-চার। এছাড়া ‘অ্যাডভান্স গ্যাস সেভার ও হিট গার্ড’ কম জ্বালানিতে দ্রুত তাপ ধরে রেখে রান্নায় সময় ও খরচ প্রায় অর্ধেক করে আনে। বিদ্যুৎহীন উপায়ে খাবার গরম রাখার জন্য রয়েছে তাঁর তৈরি ‘সবুজ রান্নার ব্যাগ’ বা ‘ম্যাজিক ওভেন’।
আম্ফান, ইয়াস ও দেশব্যাপী বিভিন্ন প্রলয়ঙ্করী বন্যার সময় এসব বহনযোগ্য সবুজ চুলা হাজার হাজার দুর্যোগকবলিত মানুষের রান্নার সংকট দূর করতে বড় ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া মাল্টিলেয়ার পলিথিন থেকে তৈরি ‘সবুজ রান্নার হট বক্স’ রাঁধুনিদের শ্রমঘণ্টা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি পলিথিন দূষণ রোধে সহায়তা করছে।
উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় সুপেয় পানির সংকট নিরসনে প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেছে ‘অ্যাডভান্স বায়ো-স্যান্ড গ্রীন ওয়াটার ফিল্টার’, ‘ওভারহেড ব্যাংক বায়ো-স্যান্ড ফিল্টার’, সৌরশক্তিচালিত ‘নাইলো-সিমেন্ট রেইনওয়াটার রিজার্ভার’ এবং আধুনিক সোক ওয়েল সমন্বিত ‘গ্রীন ফিল্টার’। স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের জন্য তৈরি ‘টুইনপিট অ্যাডভান্স টয়লেট সিস্টেম’ ভূগর্ভস্থ পানি দূষণমুক্ত রাখতে কার্যকর। কৃষি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শূন্য বর্জ্য নীতি অনুসরণ করে গৃহস্থালির আবর্জনা থেকে উর্বর জৈব সার ও বায়ো-চার তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘গ্রীন কম্পোস্ট বক্স’। সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি উদ্ভাবনগুলোতে দিচ্ছে আজীবন রিপ্লেসমেন্ট সুবিধা এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ব্যবহারের পর মূল্য পরিশোধের সুযোগ। পাশাপাশি দুস্থ নারীদের এসব প্রযুক্তি তৈরির কাজে সম্পৃক্ত করে কর্মসংস্থান তৈরি করা হচ্ছে। মেলায় প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে প্রথম স্টলে এসব প্রযুক্তির বাস্তব ব্যবহার তুলে ধরা হচ্ছে। রান্না করা খাবার খাইয়ে দর্শনার্থীদের সরাসরি ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে সেখানে।
আন্তর্জাতিক ‘ব্লু কম্পিটিশন’-এ পুরস্কৃত হওয়ার পাশাপাশি হেলভেটাস, সুইস কন্টাক্ট, ওয়াটারএইড, রেড ক্রস ও এসডোর মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্বে সিদ্দিকী’স গ্রীন টেকনোলজির প্রযুক্তিগুলো উপকূলীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। মেলায় আসা দর্শনার্থী ও বিশিষ্টজনেরা জানান, বর্জ্যকে সহজ প্রযুক্তিতে পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তি ও সারে রূপান্তরের উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই ১৭টি প্রযুক্তি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষায় বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখতে পারে।