ঘুষের বিনিময়ে নামজারিতে

শাস্তির বদলে শুধু দায়সারা বদলিতে প্রশ্নের মুখে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন

মো: ইমরান হোসাইন; তানোর, রাজশাহী | প্রকাশ: ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৫৩ এএম
শাস্তির বদলে শুধু দায়সারা বদলিতে প্রশ্নের মুখে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন
রাজশাহীর তানোর সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা তানভীর আহমেদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ও গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে কেবল বদলি করায় চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। গত ১৩ আগস্ট রাজশাহী জেলা প্রশাসকের এক আদেশে অত্র কার্যালয়ের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর অভিজিত সরকার স্বাক্ষরিত এক বদলি আদেশে তাকে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়ানী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করা হলেও কোনো দৃশ্যমান শাস্তি না হওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষ। জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ১৩ আগস্ট রাজশাহী জেলা প্রশাসকের অনুমোদনক্রমে রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর অভিজিত সরকার স্বাক্ষরিত এক আদেশে আগামী ১৭ আগস্ট স্ব-স্ব কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত হবেন এবং ১৮ আগস্ট বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করবেন। জানা গেছে, গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর এলাকাবাসী ওই দুর্নীতিবাজ ভূমি কর্মকর্তার কঠোর শাস্তির আশা করেছিলেন। তবে, গত ১৩ আগস্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাকে তানোর থেকে কেবল অন্য জায়গায় বদলি (স্ট্যান্ড রিলিজ) করে। কোনো বিভাগীয় শাস্তি বা আইনি পদক্ষেপ ছাড়া এই সাধারণ বদলিকে ভুক্তভোগীরা ' দুর্নীতিবাজ প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়' হিসেবে দেখছেন। এই সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তানোর পৌর সদরের গোল্লাপাড়া মহল্লার ভুক্তভোগী বাসিন্দা সাকিল এবং জিওল মহল্লার রুহুল আমীন জানান, তানভীর আহমেদের হয়রানি ও অনৈতিক দাবির কারণে তারা দীর্ঘদিন ধরে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশের পর তারা ভেবেছিলেন এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার উপযুক্ত শাস্তি হবে। কিন্তু শাস্তি না দিয়ে শুধু বদলি করায় তারা হতাশ। এর ফলে জনমনে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে এবং প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ঘটনাক্রম ও ভুক্তভোগীর অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, তানোর পৌর সদরের গোল্লাপাড়া মহল্লার বাসিন্দা মো. সাকিল আহমেদ তাঁর মায়ের জমির নামজারির জন্য ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান। সেখানে উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ ফাইলের বিভিন্ন ত্রুটি দেখিয়ে প্রথমে আড়াই লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। নিরুপায় হয়ে ভুক্তভোগী সাকিল তাকে ৫০ হাজার টাকা প্রদান করলে জমির নামজারি সম্পন্ন করা হয়। পরবর্তীতে সরকারি ডিসিআর ফি পরিশোধ করে অনলাইন দাখিলা সংগ্রহ করতে গেলে ওই কর্মকর্তা আবারও ৫ হাজার টাকা দাবি করেন। এই বাড়তি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে, নামজারি সম্পন্ন হওয়ার ৪৩ দিন পর কোনো নোটিশ ছাড়াই তা বাতিল করা হয় বলে ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন। এই অনিয়মের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী সাকিল আহমেদ গত ২ আগস্ট রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের এমপি, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও এডিসির এভিনিউ বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ১৩ আগস্ট তাকে রাজশাহী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর অভিজিত সরকার স্বাক্ষরিত এক বদলি আদেশে তাকে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়ানী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করা হয়। স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের দাবি, সরকারি চাকুরিতে দুর্নীতি বা ঘুষ গ্রহণের মতো গুরুতর অপরাধ প্রমাণিত হলে বা অভিযোগ উঠলে বিভাগীয় কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু তানভীর আহমেদের ক্ষেত্রে 'শাস্তি নয়, শুধুই বদলি' করায় প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, অপরাধ করার পর কেবল কর্মস্থল পরিবর্তন কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং এটি দুর্নীতিকে আরও উৎসাহিত করে। গঠনমূলক সংস্কারের তাগিদভূমি সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া ডিজিটাল বা অনলাইন করলেও তৃণমূল পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার কারণে পুরো ব্যবস্থার ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। তানোরের এই ঘটনাটি ইঙ্গিত করে যে, কেবল ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করাই যথেষ্ট নয়, বরং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া জরুরি। এলাকাবাসীর জোর দাবি, এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া উচিত। একই সাথে কেবল বদলি নয়, বরং সাময়িক বরখাস্ত বা বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কেউ সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের এভাবে হয়রানি করার সাহস না পায়। এব্যাপারে তানোর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নাঈমা খান বলেন, তানোর সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ সজীবকে গত ১৩ আগস্ট তাকে রাজশাহী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর অভিজিত সরকার স্যার স্বাক্ষরিত এক বদলি আদেশে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়ানী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করা হয়েছে।
আপনার জেলার সংবাদ পড়তে