পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ধানখালী ইউনিয়নে স্থাপিত কয়লাভিত্তিক মেগা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রেক্ষিতে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে পরিচালিত গণগবেষণায় জানানো হয় কৃষিজমি ও উন্মুক্ত জলাশয় হারিয়ে যাওয়ায় এসব মানুষকে তাঁদের চিরাচরিত স্বাধীন পেশা ছাড়তে হয়েছে। এখন এসব মানুষ বাধ্য হয়ে কোন উপায় না পেয়ে স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ধানখালী ইউনিয়নের পরিবেশগত ও আর্থ-সামাজিক জীবনযাত্রার ওপর একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের প্রভাব নিয়ে পরিচালিত গণগবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে। ওই ইউনিয়নের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিজস্ব উদ্যোগে পরিচালিত গণগবেষণার তথ্যের উপর ভিত্তি করে ‘ আমাদের মাটি, আমাদের জীবন’ শীর্ষক প্রকাশিত বুকলেটে এই সংকটের চিত্র উঠে এসেছে।
সম্প্রতি কলাপাড়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তন ‘পায়রা’ অনুষ্ঠিত গণগবেষণার ফলাফল বিষয়ক আলোচনা সভায় বিস্তারিত উপস্থাপন করা হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন কলাপাড়া পরিবেশ ও জনসুরক্ষা মঞ্চের কার্যনির্বাহী সদস্য সাংবাদিক মেজবাহউদ্দিন মাননু। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: আরিফুজ্জামান, গণগবেষক মেহেদী হাসান, হালিমা আয়েশা। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপনা করেন একশনএইড বাংলাদেশের এসোসিয়েট প্রোগ্রাম অফিসার মারজিয়া জাহান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চলনা করেন প্রান্তজনের মাঠ সমন্বয়কারী সাইফুল্লাহ মাহমুদ। অনুষ্ঠানে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকার মানুষ, সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ অংশ নেন।
গবেষনার ফলাফল প্রকাশে বলা হয, ধানখালীতে কয়েকটি অপরিকল্পিত জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক মেগা প্রকল্প (তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র) নির্মাণের পর স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় নজিরবিহীন পরিবর্তন দেখা দেয়। এ প্রেক্ষাপটে দুই বছর আগে ‘প্রান্তজন’-এর উদ্যোগে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আরিফুর রহমানের সহযোগিতায় ২০ জন স্থানীয় বাসিন্দাকে নিয়ে ওই এলাকায় একটি গণগবেষণা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্তরা স্থানীয় পর্যায়ে গণগবেষণা পরিচালনা করেন। তবে বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকতে অপারগতা করেন। এমনকি জরেিপর মতামত নিয়ে তারা মিডিয়াকেও কোন বক্তব্য দেননি।
স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা প্রান্তজনের বাস্তবায়নে ও প্রকাশিত এই গণগবেষণায় উন্নয়ন সংস্থা একশনএইড বাংলাদেশ সহায়তা করেছে। গণগবেষণায় বলা হয়েছে, চিরায়ত স্বাধীন পেশা কৃষিতে ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। মেগাপ্রকল্প এলাকার ৪৫৭ জন উত্তরদাতার ওপর পরিচালিত জরিপে বলা হয়েছে, ওখানকার প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ছিল কৃষি। জরিপে অংশ নেয়াদের মধ্যে ১৬১ জন কৃষক বলেছেন তারা এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পেশায় সচল ছিলেন। ছিলেন স্বাবলম্বী। কিন্তু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পরে কৃষি পেশায় টিকে আছেন মাত্র ৫১ জন। বাকি ১১০ জনে পেশা হারিয়েছেন। এসব মানুষ সরাসরি তাদের আয়ের মূল উৎস ও স্বাধীন পেশা কৃষিকাজ হারিয়েছেন।
উত্তরদাতাদের মধ্যে গৃহিনীর সংখ্যা ৯৮ জন থেকে ১৫২ জনে উন্নীত হয়েছে। অথচ যাদের সংখ্যা বেড়েছে তাঁরা আগে কৃষিকাজ করতেন। একইভাবে প্রকল্পের আগে উত্তরদাতাদের মধ্যে ৪৯ জন দিনমজুর ছিলেন। পরে তাঁদের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৭১ জন। কর্মসংস্থানের অভাবে বেকার ৭ জনের জায়গায় বেড়ে হয়েছে ৩২ জন। প্রকল্প বাস্তবায়নের পরে এসব পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতায় ধ্বস নেমেছে, বাড়ছে সামাজিক সংকট। এই নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী প্রকল্পের আগে ভালো কিংবা খুব ভালো আছেন বলেছেন, ৬৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ। আর প্রকল্প বাস্তবায়নের পরে ভালো কিংবা খুব ভালো আছেন বলে মতামত দিয়েছেন মাত্র ১০ দশমিক ০৭ শতাংশ মানুষ। ৭১ দশমিক ৩৩ শতাংশ বলেছেন, বর্তমানে খারাপ কিংবা খুব খারাপ আছেন। একইভাবে পরিবশেগত বিপর্যয় ও বহুমাত্রিক ঝুঁকি, সুপেয় পানির সংকট ও জলাশয়ের মরণদশা, বিশুদ্ধ বায়ুর অভাব, ক্ষতিগ্রস্ত জীববৈচিত্র ও বাস্তুসংস্থানের সংকট বেড়েছে। বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়েছে বলে মতামত দেয়া হয়েছে। মেগা প্রকল্পের আগে ধানখালীতে নদী কিংবা খালে ইলিশসহ ত্রিশের অধিক প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন এসব নাই বললেই চলে মতামত দেয়া হয়েছে। এভাবে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্য সংকটসহ বহুমাত্রিক রোগবালাই, নারীদের ওপর লিঙ্গভিত্তিক প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই গণগবেষণা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন এলাকায় পরিচালিত হয়। এর প্রভাবকে বলা হয়েছে জীবনমুখী পর্যবেক্ষণের ফলাফল। গবেষণায় ধানখালীর ৮টি ওয়ার্ডের প্রথম পর্যায়ে ৪৫৭টি ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩৯৬টি পরিবারের ওপর বিস্তারিত সামাজিক ও পরিবেশগত জরিপ চালানো হয়। এছাড়া উঠান বৈঠক ও মূল তথ্যদাতার সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য কলাপাড়ার ধানখালীতে ১৩২০ মেগাওয়াট পায়রা (বিসিপিসিএল) ও একই উৎপাদন ক্ষমতার পটুয়াখালী (আরএনপিএল) দু’টি বিদ্যুত প্লান্ট সচল রয়েছে। আরো একটি (আশুগঞ্জ) বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণকরা হয়েছে। এসব জমি অধিগ্রহণে সরাসরি অন্তত ৬৮৫ পরিবার গৃহহারা হয়েছে। সরাসরি এসব পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এছাড়া পরোক্ষভাবে অন্তত দেড় হাজার কৃষক ও জেলে পরিবার কর্মস্থান হারিয়ে ক্ষতির কবলে পড়েছেন। বর্তমানে প্রকল্প এলাকার মানুষ তাঁদের এসব ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য সামাজিক আন্দোলন করছেন। তাঁরা সরকারের এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।