পানিতে ডুবে মৃত্যু এমন একটি জনস্বাস্থ্য সংকট, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য। তবু প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষ এই নীরব বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) একে যথার্থই ‘নীরব মহামারি’ হিসেবে অভিহিত করেছে। বাংলাদেশেও পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের, যেখানে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৮ হাজার মানুষের প্রাণ ঝরে যায় পানিতে ডুবে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব মৃত্যুর বড় অংশই শিশুদের। চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক চিত্র এই সংকটের ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। গত চার বছরে জেলায় অন্তত ২৮২ জন পানিতে ডুবে মারা গেছেন, যা বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে সর্বোচ্চ। পাহাড়ি ছড়া, নদী, পুকুর, সমুদ্রসৈকত ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ঘটে যাওয়া এসব দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে অসচেতনতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং সাঁতার না জানার মতো বাস্তব কারণ। বিশেষ করে ৯ বছরের নিচের শিশুদের মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি হওয়া আমাদের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা। পানিতে ডুবে মৃত্যু কেবল পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়ন ইস্যু। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘ ২৫ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ডুবে মৃত্যুর হার ৩৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকেও কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আকস্মিক বন্যা, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা বৃদ্ধির ফলে ভবিষ্যতে এ ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পানিতে ডুবে মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব। এজন্য শিশুদের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা, ছোটবেলা থেকেই সাঁতার শেখানো, নদী বা সমুদ্রে চলাচলে লাইফজ্যাকেট ব্যবহার, পর্যটনকেন্দ্রে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা জরুরি। পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষায় সাঁতার প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ জলাধার গড়ে তোলার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। এ সমস্যা মোকাবিলায় শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, পর্যটন কর্তৃপক্ষ এবং পরিবার-সবার সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। প্রতিটি বর্ষা মৌসুমে সচেতনতামূলক প্রচার, ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় চিহ্নিতকরণ এবং নিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পানিতে ডুবে মৃত্যু কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়। প্রয়োজন সময়োপযোগী নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সামাজিক সচেতনতা। প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দেওয়া গেলে প্রতি বছর অসংখ্য শিশুসহ শত শত মানুষের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হবে। একটি মানবিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে এই নীরব বিপর্যয় রোধে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াই সময়ের দাবি।