আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

ন্যায়বিচার নিশ্চিতে বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে

এফএনএস | প্রকাশ: ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১১ পিএম
ন্যায়বিচার নিশ্চিতে বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) নিয়ে আবারও আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সমপ্রতি হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) তাদের বিবৃতিতে দাবি করেছে, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় নানা ঘাটতি রয়েছে, যা ন্যায্য বিচার ও আইনের শাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাদের মতে, দুর্বল তদন্ত, ভিত্তিহীন অভিযোগ এবং পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়া আসামিদের আটক ও অভিযুক্ত করার ঘটনা ন্যায়বিচারের মানদণ্ড পূরণ করছে না। এইচআরডব্লিউ বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে ২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের বিচার, যেখানে ৮০০ জনের বেশি নিহত হন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের ঘটনাও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। সংস্থাটি বলছে, একাধিক মামলায় অভিন্ন ভাষার সাক্ষ্য ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাক্ষ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এমনকি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও তারা আপত্তি জানিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ অভিযোগকে একপেশে ও পক্ষপাতদুষ্ট বলা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এইচআরডব্লিউ প্রসিকিউশন বা তদন্ত সংস্থার বক্তব্য না নিয়েই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তার মতে, একই ঘটনার একাধিক আসামির বিচার হলে সাক্ষীদের বক্তব্যে সামঞ্জস্য থাকাই স্বাভাবিক। বরং ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য হলে তখনই প্রশ্ন ওঠার কথা। তিনি আরও দাবি করেছেন, তদন্ত সংস্থায় জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা এবং প্রসিকিউশন টিমে অভিজ্ঞ আইনজীবীরা দায়িত্ব পালন করছেন, তাই তাদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। এখানে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। একদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করছে না; অন্যদিকে বাংলাদেশ বলছে, এটি দেশীয় আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার কি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ন্যায্য ও নিরপেক্ষভাবে হচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল তদন্তের কারণে বিতর্কিত হয়ে পড়ছে? আমরা মনে করি, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে হবে। তবে সেই বিচার যদি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিশ্বাসযোগ্য না হয়, তাহলে তা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচারও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাই এখন জরুরি হলো ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করা। আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া, সাক্ষ্যগ্রহণে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার ওপর কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। ন্যায়বিচার শুধু আইনি প্রক্রিয়ার প্রশ্ন নয়, এটি মানবিকতা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রশ্নও বটে। তাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।