একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত ও উন্নয়ন কৌশলের ভিত্তি হলো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান। জিডিপি, মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি, জনসংখ্যা কিংবা কর্মসংস্থানের তথ্য যদি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে উন্নয়নের চিত্রও বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। গত দেড় দশকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। খেলাপি ঋণ, রপ্তানি আয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির তথ্য নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল প্রশ্ন তুলেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যের সঙ্গে সরকারি পরিসংখ্যানের অমিল এবং একই বিষয়ে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ভিন্ন তথ্য নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। সাম্প্রতিক সময়ে জনসংখ্যা, জিডিপি ও রপ্তানি আয়ের হিসাব নিয়েও যে অসামঞ্জস্য সামনে এসেছে, তা পরিসংখ্যান ব্যবস্থার মানোন্নয়নের প্রয়োজনীয়তাকেই স্পষ্ট করেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পরিসংখ্যান ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য একটি বিশেষজ্ঞ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। তারা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (বিবিএস) আরও স্বচ্ছ, পেশাদার ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন করার সুপারিশ করেন। কিন্তু সেই সুপারিশ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। বর্তমান সরকারও এখন পর্যন্ত সংস্কার প্রক্রিয়াকে কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয়। পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু সরকারের ভাবমূর্তির বিষয় নয়; এটি অর্থনীতির প্রতিটি স্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আর্থিক সংস্থাগুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণে এসব তথ্যের ওপর নির্ভর করে। তথ্যের অসামঞ্জস্য আন্তর্জাতিক আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একইভাবে জনসংখ্যা বা মূল্যস্ফীতির সঠিক তথ্য না থাকলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও বাজেট পরিকল্পনাও বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে। অবশ্য তথ্যের কিছু পার্থক্য পদ্ধতিগত কারণেও হতে পারে। বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ ও প্রক্ষেপণ করে থাকে। তবে সেই পার্থক্যের কারণ স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা এবং তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী আধুনিকায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে তথ্য প্রকাশে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন ও পেশাদার পরিসংখ্যান ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। বিশ্বাসযোগ্য তথ্যই সুশাসনের ভিত্তি। উন্নয়নের প্রকৃত চিত্র জানতে হলে বাস্তবতাকে আড়াল না করে নির্ভুল তথ্য প্রকাশ করতে হবে। তাই পরিসংখ্যান ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং বিবিএসের সক্ষমতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এখন আর বিলম্ব করার বিষয় নয়। কারণ নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ছাড়া কার্যকর নীতিনির্ধারণ যেমন সম্ভব নয়, তেমনি টেকসই উন্নয়নও কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।