হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা প্রকৃতিনির্ভর। একটি বেড়িবাঁধ শুধু মাটির কাঠামো নয়; এটি কৃষকের ফসল, জনপদের বসতি এবং যোগাযোগব্যবস্থার নিরাপত্তার প্রতীক। তাই সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওরের উজ্জ্বলপুর বেড়িবাঁধ ভেঙে পড়ার ঘটনা কেবল একটি স্থানীয় সমস্যা নয়, এটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতারই প্রতিফলন। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২৫-২৬ অর্থবছরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় একাধিক বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বেড়িবাঁধটি উপেক্ষিত ছিল। অথচ এটি পাগনার হাওরের আমন ফসল রক্ষা, নদীতীরবর্তী জনবসতি নিরাপদ রাখা এবং জামালগঞ্জ-সুনামগঞ্জ সড়কের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ি ঢলে সুরমা নদীর পানি বেড়ে বাঁধের একটি অংশ ভেঙে যাওয়ার পর এখন কৃষিজমি, বসতবাড়ি এবং সড়ক-সবই ঝুঁকির মুখে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এটি কোনো নতুন সংকট নয়। ২২ সালের আকস্মিক বন্যায় একই বেড়িবাঁধ ভেঙে জেলার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার পরও যদি প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হয়ে থাকে, তবে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ঘাটতির প্রশ্ন তোলে। দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়াই হওয়া উচিত ছিল প্রথম অগ্রাধিকার। এ ঘটনায় বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে সমন্বয়ের অভাবও স্পষ্ট। উপজেলা প্রশাসন বলছে, প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ ও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল; অন্যদিকে ইউনিয়ন পরিষদ শ্রমিক সংকট ও বরাদ্দ বিলম্বের কথা বলছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডও দ্রুত মেরামতের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেছে। কিন্তু এসব ব্যাখ্যা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করে না। বাস্তবতা হলো, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব হতে পারত। হাওরাঞ্চলের বাঁধ ব্যবস্থাপনায় কেবল জরুরি মেরামত নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ নিয়মিত পরিদর্শন, সময়মতো সংস্কার, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, জবাবদিহিমূলক তদারকি এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্যোগের সময় জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাও আরও কার্যকর করা জরুরি। প্রতিবছর বর্ষা এলেই যদি একই ধরনের সংকট ফিরে আসে, তবে তা প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়ে বেশি প্রশাসনিক ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়। হাওরের কৃষি, যোগাযোগব্যবস্থা এবং মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় উজ্জ্বলপুর বেড়িবাঁধের দ্রুত সংস্কারের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের অবস্থাও পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ দুর্যোগের ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আগাম প্রস্তুতি ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।