ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্প্রীতি জোরদার করে একটি শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে, সংঘাত নয়, শান্তি সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ি প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ। বিশ্বম্ভরপুর পিস ফ্যাসিলিটেটর গ্রুপ (পিএফজি) এর উদ্যোগে এবং দি হাঙ্গার প্রজেক্টের এমআইপিএস প্রকল্পের সহযোগিতায় রবিবার সকালে উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে আয়োজিত এ সংলাপে শান্তি, সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সামাজিক সম্প্রীতির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধ চর্চার মাধ্যমেই একটি সুখী ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
বিশ্বম্ভরপুর পিএফজির আন্তঃধর্মীয় সাব-কমিটির আহ্বায়ক মাওলানা মোয়াফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং ইয়ুথ পিস অ্যাম্বাসেডর সামছুল কবিরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহফুজুর রহমান। সভার শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন মাওলানা জুনায়েদ আহমদ, গীতা পাঠ করেন মৃত্যুঞ্জয় বর্মন। জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে সভা শুরু হয়।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দি হাঙ্গার প্রজেক্টের ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর কুদরত পাশা। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন, এম্বাসেডর আব্দুছ ছাত্তার। উক্ত সংলাপে বক্তব্য রাখেন, প্রেসক্লাব সভাপতি স্বপন কুমার বর্মণ, পিস এম্বাসেডর সিরাজুল ইসলাম খন্দকার, পিএফজির সমন্বয়কারী ফুল মালা, নারী পিস এম্বাসেডর স্বপ্না আক্তার, অনীন্দ্র বর্মন, মাওলানা ওলীউর রহমান, মাওলানা মোশারফ হোসেন, মাওলানা মিছবাহুর রহমান, সুখেশ চন্দ্র দেবনাথ, রত্নাকর হাজং, সংগীতা হাজং, গোলাপ মিয়া, আজিজা, ঊর্মিলা হিজড়া।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেন, “বিশ্বম্ভরপুর পিস ফ্যাসিলিটেটর গ্রুপ ও দি হাঙ্গার প্রজেক্ট সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহাবস্থান প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আপনারা একটি মহৎ ও সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। আমি বিশ্বাস করি, আপনাদের এ প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিশ্বম্ভরপুরে শান্তি-সম্প্রীতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে।”
তিনি বলেন, “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। আমাদের সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালনের অধিকার দিয়েছে। তাই ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবাইকে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতার চর্চা করতে হবে।” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “বর্তমান সময়ে অনেক বিভ্রান্তি ও সংঘাতের সূত্রপাত হয় অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া অসত্য ও উসকানিমূলক তথ্য থেকে। তাই কোনো সংবাদ, ছবি বা তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়া প্রচার না করে সবাইকে দায়িত্বশীল ও সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “দি হাঙ্গার প্রজেক্ট ও পিএফজির এ উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। উপজেলা প্রশাসন সবসময় এ ধরনের জনকল্যাণমূলক ও সম্প্রীতি-ভিত্তিক কার্যক্রমের পাশে থাকবে। ভবিষ্যতেও এমন আয়োজনের সঙ্গে প্রশাসনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।” শেষে তিনি এ কার্যক্রমের সার্বিক সফলতা কামনা করে আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান এবং একটি অসাম্প্রদায়িক, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক বিশ্বম্ভরপুর গড়ে তুলতে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানান।
সংলাপে ধর্মীয় নেতারা বলেন, ইসলাম, হিন্দু, খ্রিস্টানসহ সকল ধর্মই মানবতা, সহমর্মিতা ও শান্তির শিক্ষা দেয়। নিজ নিজ ধর্মীয় শিক্ষার আলোকে সম্প্রীতির বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে এবং বিভেদ নয়, ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সভায় দি হাঙ্গার প্রজেক্ট ও পিএফজির চলমান কার্যক্রম এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের ভূমিকার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। বক্তারা ধর্মীয়, জাতিগত ও রাজনৈতিক সহিংসতা পরিহার করে একটি শান্তিপূর্ণ, সহনশীল ও মানবিক বিশ্বম্ভরপুর গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। সংলাপ শেষে অংশগ্রহণকারীরা শান্তি, সম্প্রীতি ও সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তাদের মতে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চাই পারে একটি সুন্দর, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বিশ্বম্ভরপুর গড়ে তুলতে।