বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে

“শিশুশ্রমকে লাল কার্ড দেখাই’’ বিষয়ক মানববন্ধন

এফএনএস (মিজানুর রহমান; চাঁদপুর) : | প্রকাশ: ১৫ জুন, ২০২৬, ০৪:৫৪ পিএম
“শিশুশ্রমকে লাল কার্ড দেখাই’’ বিষয়ক মানববন্ধন

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) ও টিআইবি, চাঁদপুরের আয়োজনে “শিশুশ্রমকে লাল কার্ড দেখাই: শিশুর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করি, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান গড়ি”এই প্রতিপাদ্যের উপর মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মূলত শিশুশ্রম প্রতিরোধে শক্তিশালী আইন ও নীতি প্রণয়ন এবং কঠোর প্রয়োগ, শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া, উন্নত তথ্য ব্যবস্থাপনা ও তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করে গতকাল ১৫ জুন ২০২৬ চিত্রলেখা মোড়, চাঁদপুরে  সনাক-টিআইবি এই মানববন্ধনের আয়োজন করে।

মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ অধিদপ্তর চাঁদপুরের উপ-পরিচালক মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, আমরা শিশুদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার মধ্যে আনতে পারলে তাদের প্রতিভা আরও বেশি বিকশিত হবে। আমাদেরকে শিশুশ্রম প্রতিরোধে কাজ করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি শিশুশ্রম বন্ধে আমাদের সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। শিশুরা ছোটবেলা থেকে যদি তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ না পায় তাহলে রাষ্ট্রও অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তিনি আরও বলেন, সরকারিভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শিশুদের দিয়ে কোন কাজ করানো হয় না। হয়তো বেসরকারিভাবে ও ব্যক্তিভাবে শিশুদেরকে কাজের সাথে যুক্ত করা হয়। শিশুদেরকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত না করে তাদেরকে লেখাপড়ায় সুযোগ করে দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি এমন একটি মানববন্ধন আয়োজন করার জন্য সনাক ও টিআইবিকে ধন্যবাদ জানান।

সনাক সভাপতি আলমগীর পাটওয়ারী বলেন, আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যত জাতিকে উন্নয়নের পথে ভূমিকা রাখবে এই শিশুরাই। তাই শিশুদের মেধা বিকাশ ও শিশুশ্রম বন্ধে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। সকল ক্ষেত্রে শিশুশ্রম নিয়ে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। শিশুরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনেক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। অনেক সময় মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক পরিবার দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করার কারণে শিশুদের দিয়ে কাজ করাচ্ছে। আমাদেরকে শিশুদের সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠা ও তাদের প্রতিভা বিকাশে কাজ করতে হবে। তিনি মানববন্ধনে উপস্থিত হওয়ার জন্য বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে ধন্যবাদ জানান।

সনাকের সাবেক সভাপতি কাজী শাহাদাত বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্বল্প টাকায় শিশুদের নিয়োগ দিয়ে তাদেরকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। তবে চাঁদপুরে এক প্রভাব কমেছে। শিশুশ্রম তেমন একটা চোখে পড়ে না। অনেক শিশুরা সংসারের অনটনের কারনে অনেক সময় বাসা-বাড়ি, কলকারখানা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাজ করে থাকে। এক্ষেত্রে তাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। শিশুশ্রম প্রতিরোধে সরকারই এব্যাপারে মূখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। তিনি সরকারকে বিভিন্ন ভাতার পরিমান বৃদ্ধি ও সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়কে অসহায় শিশুদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেওয়ার আহ্বান জানান। সরকারের পাশাপাশি সাধারণ জনগণকে শিশুশ্রম বন্ধে আরও বেশি সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

দিবসের উপর ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ইয়েস গ্রুপের সাবেক দলনেতা মোঃ আবু হানিফ সুজিব ভূঁইয়া। মানববন্ধনে সাংবাদিক, সনাক-ইয়েস-এসিজি গ্রুপের সদস্যবৃন্দ, চাঁদপুর হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও লেডী দেহলভী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। 

দিবসটি উপলক্ষে টিআইবি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের জন্য নিম্নলিখিত সুপারিশসমূহ তুলে ধরছে- শিশুশ্রম নিরসনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা দ্রুত হালনাগাদ করতে হবে, যেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে শিশুশ্রম নিরসনের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত থাকবে; পাশাপাশি এ খাতের শিশু শ্রমিকদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা মূল্যায়ন সাপেক্ষে বিকল্প কর্মকৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে; শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নিরসন হওয়ার পূর্বে- ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়া শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কৌশল নির্ধারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে শিশুশ্রমের সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে হবে; বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণকে শিশুদের জন্য নিষিদ্ধ ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকায় যুক্ত করতে হবে; এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রম তদারকির জন্য কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে; বর্জ্য সংগ্রহে শিশুশ্রমের বিষয়টি নজরদারির জন্য সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাকে ক্ষমতায়ন ও ওয়ার্ড-ভিত্তিক তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে; এবং শিশু শ্রমের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে ওয়ার্ডের বাসিন্দা এবং পিসিএসপির জন্য সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে; শিশুশ্রম নিরসন সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালা লঙ্ঘনের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান যুক্ত করে পিসিএসপি নিবন্ধনের শর্তাবলী আরও বিস্তৃত করতে হবে; যেকোনো নাগরিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মী যাতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে শিশুশ্রমের যেকোনো ঘটনা সরাসরি জানাতে পারেন তার জন্য আলাদা একটি হটলাইন চালু করতে হবে; সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন এবং ল্যান্ডফিল/ ডাম্পিং সাইটের মতো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মূলকেন্দ্রগুলো নজরদারির জন্য বিশেষায়িত শিশুশ্রম পর্যবেক্ষণ ইউনিট গঠন করতে হবে; বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতের জন্য শিশুশ্রম নিরসন সংক্রান্ত নির্দেশিকা তৈরিতে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান শিশুশ্রম পর্যবেক্ষণ ইউনিট এবং জাতীয় শিশুশ্রম কল্যাণ পরিষদকে সমন্বয়ের দায়িত্ব প্রদান করতে হবে; নিবন্ধন, লাইসেন্স এবং সমবায়ের মাধ্যমে অপ্রাতিষ্ঠানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মীদের মূলধারায় একীভূত করতে হবে; এবং আসন্ন উৎপাদকের সম্প্রসারিত দায়িত্ব (ইপিআর) কাঠামোতে উৎপাদক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে, প্লাস্টিক ও ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধনের ক্ষেত্রে শিশুশ্রম নিরসনমূলক শর্ত অন্তর্ভুক্ত করতে হবে; বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে মর্যাদাপূর্ণ কর্মক্ষেত্র ও শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শিশুশ্রম নির্মূলে শ্রম আইন, ২০০৬ প্রয়োগ করতে হবে; এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে শিশুশ্রম সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করার লক্ষ্যে জনগণকে সচেতন করতে ব্যাপকভাবে প্রচারণা কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে