চর দখলের মতো প্রতিযোগিতা দিয়ে বেদখল হয়ে যাচ্ছে দেশের ২১ টি বন গবেষণা কেন্দ্রের জমি। সবচেয়ে বেশি বেদখলে চলে যাচ্ছে সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া বন গবেষণা কেন্দ্রের সিলভিকালচার রিসার্চ বিভাগের জমি। ১০৮৪ একর পাহাড়ি সমতল ভূমি নিয়ে গঠিত এই গবেষণা কেন্দ্রের যেন কোন অভিভাবক নেই। নামে গবেষণা কেন্দ্র হলেও এখন আর এখানে গবেষণা হয় না। কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও অলস সময় কাটাচ্ছেন। কেউ ১০ বছর, কেউ ২০ বছর, কেউ আরো বেশী সময় ধরে একই কেন্দ্রে কর্মরত। অনেকে ঠিক মত কেন্দ্রেও থাকে না। মাসের অধিকাংশ সময় শহরে থাকে। মাস শেষে একবার এসে পুরো মাসের স্বাক্ষর করে বেতন তুলে নেয়। আর কেউ কেউ কেন্দ্রের বাসায় থাকেন। পাশের গ্রামের দখলদারদের কাছ থেকে দুধ নিয়ে আসেন। বাকিটা সময় আড্ডা আর ঘুরাঘুরির মাধ্যমে পার করে দেন। অবৈধ দখল এবং চুরি ঠেকাতে তাদের কোন তৎপরতা পরিলক্ষিত হয় না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় লোকজন জানান, অবহেলিত অথচ দৃষ্টিনন্দন এ বনাঞ্চলে পড়েছে শকুনের চোখের মতো দখলদারের চোখ। ইতিমধ্যে গবেষণা কেন্দ্রের জমিতে অবৈধভাবে গড়ে উঠছে ব্যক্তিগত বসতবাড়ি, মাছের খামার, পোলট্রি ফার্মসহ নানা স্থাপনা। ধনাঢ্য ব্যক্তিরাও পিছিয়ে নেই সরকারি জমি দখলে। যে যেভাবে পারছে দখল করছে। এ যেন সীতাকুন্ডের জঙ্গল সলিমপুরের মত আরেকটি ভয়াল জনপদ সৃষ্টি হচ্ছে।
দেশের ২১ গবেষণা কেন্দ্রের মধ্যে বেশি জমি কেঁওচিয়া গবেষণা কেন্দ্রে, যার আয়তন ১০৮৪ একর। কিন্ত প্রায় ৬০০ একরের মতো গবেষণা কেন্দ্রের পাহাড়ি জমি ইতিমধ্যে বেদখল হয়ে গেছে।
দখলদারের কাছে গবেষণাকেন্দ্রের অপ্রতুল জনবল অসহায়। দিন যতই যাচ্ছে দখলদারের ভিত ততই শক্ত হচ্ছে সেখানে। এখনই জরুরি পদক্ষেপ না নিলে দখলদারদের উচ্ছেদ করা কঠিন হয়ে পড়বে, এমনটাই আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের বাইতুল ইজ্জ্বত এলাকায় অবস্থিত গবেষণা কেন্দ্রের জরাজীর্ণ অফিস ভবন। কেঁওচিয়া থেকে পার্শ্ববর্তী ছদাহা ইউনিয়নের সাড়াশিয়া মৌজা পর্যন্ত গবেষণা কেন্দ্রটি বিস্তৃত। গবেষণা কেন্দ্রের পাহাড়ি জমিতে দখলদাররা কোথাও গড়ে তুলেছে বসতবাড়ি, কোথাও মাল্টা বাগান, কোথাও মাছের খামার আবার কোথাও পোল্ট্রি ফার্ম। একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির চোখ পড়েছে গবেষণা কেন্দ্রের জমিতে।
দিন দিন দখলদারের সংখ্যা বাড়ছে। বিক্রিও হচ্ছে দখলস্বত্ব। পাহাড়ি এ জমিতে বাড়ছে রোহিঙ্গা বসতি। তারা আলাদা পাড়া ও সমাজ গড়ে তুলেছে। রীতিমত সমাজ সরদার পরিচয় দিয়ে বিচারের আসর বসায় কেউ কেউ। রোহিঙ্গা পাড়ায় কেউ গড়ে তুলেছে আলীশান পাকা দালান। কেউ গড়েছে টিনের ঘর। কেউ বাস করছে ত্রিপলের ছাউনিতে। তাদের বেশির ভাগ মাদক কারবারি। অনেকের বিরুদ্ধে পতিতাবৃত্তির অভিযোগও রয়েছে। চুরি ও ছিনতাইয়ে জড়িয়ে কারাগারেও গেছে কেউ কেউ।
বন গনেষণার জায়গার হরিণতোয়া অংশে গড়ে ওঠা রোহিঙ্গা পাড়ার নেতা সানাউল্লাহ, দিল মুহাম্মদ, ছিদ্দিকসহ আরো অনেকের বিরুদ্ধে মানব পাচারের ভয়াবহ অভিযোগ রয়েছে। তারা ভুয়া তথ্য দিয়ে এনআইডি তৈরি করেছে। তিন লাখ টাকার চুক্তিতে তারা আরো অনেক রোহিঙ্গাকে এনআইডি এবং পাসপোর্ট তৈরি করে দিয়েছে। অনেককে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে। অনেক রোহিঙ্গা এখানে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। কাবিন রেজিস্ট্রি ছাড়া কেবল মৌলভীর গোপন আকদের মাধ্যমেই তাদের সংসার শুরু হয়ে যায়। অনেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে মেয়ে এনে মৌলভীর মাধ্যমে আকদ পড়িয়ে সংসার শুরু করে দেয়। কিছুদিন পর ভাল না লাগলে তাড়িয়ে দেয়। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনিস্টিটিউট চট্টগ্রামের পরিচালক মোহাম্মদ তারিফুল বারী জানান, দখলদারদের কোনমতেই থামানো যাচ্ছে না। গবেষণা কেন্দ্রের মূল ক্যাম্পাসেও দখলদাররা হানা দিয়েছে। অনেকে নামজারিও করে ফেলেছে। জনবল সংকটের কারণে আমরা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। সরকারি জমি রক্ষার্থে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতা খুবই জরুরি।
জানা যায়, বাংলাদেশে গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে ২১টি। এরমধ্যে চট্টগ্রামে রয়েছে ৬টি। এগুলো হলো, সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া, ফটিছড়ির হাজারীখিল এবং হেঁয়াকো, রাঙ্গুনিয়ার ইছামতি, মীরসরাইয়ের হিংগুলি ও সীতাকুণ্ড গবেষণা কেন্দ্র। বাকি ১৫টির মধ্যে ৩টি কক্সবাজারে। এছাড়া টাঙ্গাইল, দিনাজপুর, শ্রীমঙ্গল, কাপ্তাই, গাজীপুর, মৌলভীবাজার, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, খুলনার দাকোপ, ভোলা, পটুয়াখালির গলাচিপা এবং নোয়াখালীতে একটি করে গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে ।
২১টি গবেষণা কেন্দ্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জমি রয়েছে সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া সিলভিকালচার রিসার্চ সেন্টারে। যার আয়তন ১০৮৪ একর। এটি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯৬৬ সালে। সিলভিকালচার হলো, বন গবেষণার একটি বিভাগ। যা গাছের চাষ, পরিচর্যা, বন পুনর্জন্ম ও টেকসই ব্যবস্থাপনার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করে। যেমন- কোন গাছ কোন মাটিতে ভালো জন্মে, কিভাবে চারা রোপণ করলে বেশিদিন বেঁচে থাকে ইত্যাদি। কেঁওচিয়া গবেষণা কেন্দ্রটি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ গবেষণা ইনস্টিটিউটের আওতায় গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা কেন্দ্র। এর কাজ মূলত উপকূলীয় ও পার্বত্যাঞ্চলের বনজসম্পদ উন্নয়ন ও সংরক্ষণ, দ্রুত বর্ধনশীল ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বৃক্ষ প্রজাতির গবেষণা, বনায়ন ও সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমের জন্য উন্নত চারা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন, মাটি ও জলবায়ু উপযোগী গাছের প্রজাতি নির্বাচন ও উন্নয়ন । সর্বোপরি এ গবেষণা কেন্দ্রটি চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় এলাকার জলবায়ু ও মাটির সাথে উপযোগী গাছের প্রজাতি নির্বাচন, বন উন্নয়ন ও সংরক্ষণ কার্যক্রমকে বৈজ্ঞানিকভাবে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। জানতে চাইলে কেঁওচিয়া বন গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান বলেন, '২০১৬ সালে কেঁওচিয়া গবেষণা কেন্দ্রে যোগদানের পর থেকে আমরা প্রায় ৩'শ একর জমি পুনরুদ্ধার করতে পেরেছি। তবে জনবল ও লজিস্টিক সংকট, পাশাপাশি প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের কারণে বন গবেষণা কেন্দ্রের জমি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।'