রাজশাহী মহানগরীর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য স্মৃতি ও ঐতিহ্য। প্রতিটি শহরের একটি ইতিহাস থাকে। এমন ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়েই শহরের নাগরিকদের থাকে গর্ব। রাজশাহীও এর ব্যতিক্রম নয়। রাজশাহীর আছে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। আশেপাশে এখনো দেখা যায় সেই সব ঐতিহ্যের কিছু নিদর্শন। রাজশাহীর ঐতিহাসিক নিদর্শনের মধ্যে একটি হলো ঢোপকল।ঢোপকল রাজশাহীর অনেক পুরাতন ঐতিহ্য এবং এর সাথে রাজশাহীর ইতিহাস ও সৌন্দর্য জড়িত।
প্রায় ৮৮ বছর আগে মহারানী হেমন্ত কুমারীর অনুদানে ১৯৩৭ সালে রাজশাহীতে ঢোপকল স্থাপিত হয়। এই কল স্থাপনের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। এই প্রকল্প মহারানী হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কস রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী ঢোপকল। এই ঢোপকল তৈরির সময় তৎকালীন রাজশাহীর দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলেন রাইটিন দাশগুপ্ত। সেই সময় রাজশাহীতে বিশুদ্ধ ও পানযোগ্য পানির খুবই অভাব ছিল। তার ফলে ছড়িয়ে পড়েছিল কলেরা ,আমাশয়সহ বিভিন্ন ধরনের পেটের পীড়া। সেই সময় এই অসুখে বেশ কিছু লোকের মৃত্যুও ঘটেছিল।রাইটিন দাশগুপ্ত তৎকালীন পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকাকালীন রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে নগরবাসীর জন্য সুপেয় পানযোগ্য পানির সরবরাহের দায়িত্ব নেন। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় রাস্তার মোড়ে মোড়ে পানির জন্য ঢোপকল বসানো হবে। ১৯৩৭ সালের আগস্ট মাসের কোন এক দিনে মিনিস্ট্রি অফ ক্যালকাটার অধীনে পানি সরবরাহ ও বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। ব্যয় করা হয় প্রায় আড়াই লাখ টাকারও বেশি। এবং নামকরা ধনী লোকদের এগিয়ে আসার জন্য অনুরোধ করা হয়। সেই সূত্রেই মহারানী হেমন্তকুমারী দান করেন প্রায় ৬৫০০০ টাকা। বিশাল অংকের একক অনুদানের কারণে রাজশাহী জেলা বোর্ড হেমন্ত কুমারী ওয়াটার ওয়ার্কস স্থাপন করা হয়। কালক্রমে তা হেমন্ত কুমারী ঢোপকল নামে পরিচিত হতে থাকে। পুরো শহর জুড়ে প্রায় শতাধিক ঢোপকল স্থাপন করা হয়। মহারানী হেমন্ত কুমারী পানি শোধন কেন্দ্রে পানিকে বিভিন্ন ট্রিটমেন্ট করে পানি বিশুদ্ধ করে তা সরবরাহ করা হতো সেই ঢোপগুলোতে। তবে সর্বপ্রথম পাথরকুচির ফিলটার দিয়ে পানি ফিলটার করা হতো। এরপর সিমেন্টের তৈরি মোটা পাইপে বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হতো। প্রতিটির পানি ধারণ ক্ষমতা ৪৭০ গ্যালন। প্রতিটি ঢোপকলেই ছিল একটি রাফিং ফিলটার। এতে বালি ও পাথরের স্তর থাকায় সরবরাহ করা পানি আরো পরিশোধিত হয়ে বের হতো। এবং গরমের সময় মোটামুটি তা ঠান্ডাও থাকতো। সারাদিনে মাত্র দুই ঘন্টা পানি সরবরাহ করা হতো। মোড়ে মোড়ে ঢোপকলগুলিতে পানি ধরে রাখা হতো। ফলে সারাদিনই পানি পাওয়া যেত। দুই মাস পরপর এই ঢোপকলগুলো পরিষ্কার করা হতো। পরিষ্কার করার নিয়মটি ছিল খুবই ভালো। এই ঢোপকলের উপরের ঢাকনা খোলা যেত। ভিতরে মানুষ নেমে ব্লিচিং পাউডার ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে পরিষ্কার করতো।প্রতি দুই মাস পরপর ঢোপকল থেকে পানির স্যাম্পল সংগ্রহ করা হতো। সেটা পাঠানো হতো পরীক্ষাগারে- পানির মান ঠিক আছে কিনা তা জানতে। ঢোপকল গুলো লম্বা প্রায় ভূমি থেকে ১২ ফুট উঁচু আর ব্যাস ৪ ফুট। ঢোপকলগুলো তৈরি করা হয়েছিল সিমেন্টের ঢালাই দিয়ে। ঢোপকলের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ঢেউ খেলানো সিমেন্টের প্লাস্টার করা হতো। নকশাটা করা হতো টিনের সাহায্যে। চারিদিকে টিনের একটা রাউন্ড বানিয়ে তার মধ্যে সিমেন্ট আর খোয়া ঢালা হতো। এ ঢালাই খুবই শক্ত- সহজে কোন কিছুর ধাক্কায় ভাঙে না।রাজশাহী নগরীর ঐতিহ্য রক্ষায় কাজ করা সংগঠন ‘রাজশাহী হেরিটেজ’-এর সমন্বয়ক আবদুল মান্নান বলেন, ঢোপকল শুধু একটি পানির আধার নয়, এটি রাজশাহীর নগর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। অথচ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় এসব স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে এগুলো সংরক্ষণ করে নগর ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী এবং ফোকলোর ও উন্নয়ন গবেষক এস. এম. তাহমিদ হাসান বলেন, রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী ঢোপকল শুধু একটি পুরোনো পানির উৎস নয়, এটি আমাদের জলসভ্যতার প্রত্নস্মারক এবং ইতিহাস, প্রযুক্তি ও জনকল্যাণমূলক নেতৃত্বের এক অনন্য সাক্ষ্য। এর ইট-পাথরে লুকিয়ে আছে একটি সময়ের গল্প, যা রাজশাহীর ঐতিহ্য ও লোকস্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।তিনি আরও বলেন, উন্নয়নের পথে এমন ঐতিহ্যকে হারিয়ে নয়, সংরক্ষণ করেই এগিয়ে যেতে হবে। কারণ ঢোপকল রক্ষা করা মানে শুধু একটি স্থাপনা নয়, রাজশাহীর নগর সভ্যতার জন্ম-ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে সম্মান জানানো।
রাজশাহী ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) তৌহিদুর রহমান বলেন, ঢোপকল সংরক্ষণ নিয়ে বর্তমানে কোনো প্রকল্প নেই। অন্যদিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক কে এম সাইফুর রহমান বলেন, ছোট আকারের স্থাপনা হওয়ায় এগুলোকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে গেজেটভুক্ত করা কিছুটা জটিল। তবে ভবিষ্যতে বিষয়টি নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজশাহী সিটি কপোরেশনের (রাসিক) প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, নাগরিক ভোগান্তি কমাতে দ্রুত সড়ক নির্মাণ কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সড়ক উন্নয়ন কাজের প্রয়োজনে নগরীর কয়েকটি জায়গায় ঢোপকল স্থানান্তর করতে হয়েছে। ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও নগরীর ইতিহাস তুলে ধরতেই নতুনভাবে এগুলোর স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।