দীর্ঘদিনের শোষণ ও অব্যবস্থাপনায় ভঙ্গুর হয়ে পড়া বাংলাদেশকে পুনর্গঠনে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভঙ্গুর রাষ্ট্রটি এখন পুনর্গঠনের সময় এসেছে। একই সঙ্গে দেশের তিনটি গ্রামকে পরীক্ষামূলকভাবে ‘এসডিজি ভিলেজ’ হিসেবে উদ্বোধন করে এই মডেল সফল হলে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (১০ আগস্ট) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘Navigating Five Year Strategic Framework for Achieving SDGs: Policy, Partnership and Priorities’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। একই অনুষ্ঠানে তিনি এসডিজি ভিলেজ পাইলট কর্মসূচির আওতায় তিনটি গ্রামের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
নির্বাচিত গ্রাম তিনটি হলো রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার মিতিঙ্গাছড়ি, খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী এবং দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগর। এর মধ্যে পানখালী সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। গ্রামগুলোতে এসডিজির বিভিন্ন লক্ষ্য স্থানীয় পর্যায়ে একসঙ্গে বাস্তবায়ন করে এর ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের ফ্যাসিবাদী শোষণ ও শাসন বাংলাদেশকে ঋণনির্ভর ও আমদানিনির্ভর একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, “ভঙ্গুর এই রাষ্ট্রটি এবার পুনর্গঠনের পালা। দেশ পুনর্গঠনের এই যাত্রাপথে এসডিজির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অনস্বীকার্য।”
জনগণের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। এই কাঠামোর মাধ্যমে দেশের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনাকে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজি বাস্তবায়নে সাফল্য দেখিয়েছে। এসডিজি বাস্তবায়নেও একইভাবে কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এসডিজির মূলনীতি ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’ এবং সরকারের ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’ নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিএনপির বিভিন্ন রাজনৈতিক ও উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে এসডিজির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সামঞ্জস্য রয়েছে বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফার সঙ্গে এমডিজি ও এসডিজির ভিশন ও মিশনের মৌলিকভাবে খুব বেশি অমিল নেই। বিএনপির পরিকল্পনা ও কর্মসূচি সব সময় জনবান্ধব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের ‘সংস্কার ও উন্নয়নের পাঁচ স্তম্ভে’ দারিদ্র্য বিমোচন, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, জেন্ডার সমতা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং সুশাসনের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। এগুলো এসডিজির গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ এবং এসডিজি বাস্তবায়নে অর্জিত অগ্রগতি ধরে রাখতে সরকার ‘পুনরুদ্ধার, পুনর্বাসন, পুনর্গঠন’ বা ‘Recovery, Rehabilitation and Reconstruction’ কৌশল নিয়েছে বলে জানান তারেক রহমান।
তার ভাষ্য, এই কৌশলের মাধ্যমে সাময়িক স্থিতিশীলতা থেকে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন পর্যন্ত সবকিছু একটি সমন্বিত পথনকশার আওতায় আনা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পরদিন থেকেই বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কৃষক কার্ড এবং জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা সহজ করতে ই-হেলথ কার্ড চালুর কথা তুলে ধরেন তিনি।
তার দাবি, এসব কর্মসূচির মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষক, স্বল্প আয়ের পরিবার ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি ভর্তুকি, কৃষি উপকরণ, আর্থিক সহায়তা ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি স্পোর্টস কার্ড এবং ইমাম, মুয়াজ্জিন ও বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের সম্মানী ভাতার আওতায় আনার কথাও বলেন তিনি।
সরকারের লক্ষ্য, চলতি মেয়াদের মধ্যেই পর্যায়ক্রমে সম্ভাব্য প্রতিটি নাগরিককে সামাজিক সুরক্ষা বলয় ও আর্থিক সহায়তা কাঠামোর আওতায় আনা।
এসডিজি স্থানীয়করণের পাইলট মডেল হিসেবে নির্বাচিত তিনটি গ্রামে একাধিক কর্মসূচি একযোগে বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, সেখানে ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড, কৃষক কার্ড, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ঋণ, স্কুল ড্রেস, মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রাম পর্যটন, ব্লু-এমপ্লয়মেন্ট, ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট, বৃক্ষরোপণ, খাল খনন ও ইকোট্যুরিজমের মতো কর্মসূচি পরীক্ষামূলকভাবে নেওয়া হবে।
এর পাশাপাশি এসব উদ্যোগের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হবে। সাফল্য পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য গ্রামেও এসডিজি ভিলেজ মডেল সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি আশা করেন ‘এসডিজি ভিলেজ’ সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ‘ডেভেলপমেন্ট মডেল’ হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার দৃষ্টান্তমূলক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠবে।
এসডিজি ভিলেজের মূল লক্ষ্য হলো একটি গ্রামকে দারিদ্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন, পরিবেশ ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও টেকসই ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসডিজি বাস্তবায়ন কোনো একক মন্ত্রণালয় বা বিভাগের পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিন দিনের জাতীয় সম্মেলনে বিভিন্ন সমন্বয়কারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা করে বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা নেবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আগামী দিনের রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, লক্ষ্য একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে অবাধ নির্বাচন, আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা থাকবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নাগরিক অধিকার সর্বজনীন করে একটি মানবিক রাষ্ট্র এবং প্রতিটি নাগরিকের অর্থনৈতিক সুযোগ ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায় সরকার।
২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে সবাইকে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস. এম. শাকিল আখতার এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক, গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিট এবং বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগকে সম্মেলন আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।