ইলিশের ভরা মৌসুমেও পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর ও আলীপুর মৎস্য বন্দরে তীব্র বরফ সংকট চলছে। মাছ ধরতে সাগরে যেতে পারছে না শত শত ট্রলার। বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বরফ উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ নেমে এসেছে অনেক নিচে। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহ ধরে অনেক ট্রলার বরফের অভাবে সাগরে যেতে না পেরে ঘাটে নোঙর করে পড়ে আছে।
মৎস্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ১৫০ টাকার একটি বরফের ক্যান এখন বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকায়। তাও অর্ধেক জমাট বরফ। বাড়তি দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় বরফ মিলছে না। ফলে একদিকে জেলেরা মাছ ধরতে যেতে পারছেন না, অন্যদিকে লোকসান গুনছেন ট্রলার মালিক ও বরফকলের মালিকেরা। তারা মৎস্য বন্দরগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন।
মহিপুর ও আলীপুর মৎস্য বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, দুটি বন্দরে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ৩৬টি বরফকল রয়েছে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে এসব বরফকলের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। কোনো কোনো বরফকল দিনে মাত্র ২০ থেকে ২৫ ক্যান বরফ উৎপাদন করতে পারছে। আবার কোনোটি সর্বোচ্চ ২০০ ক্যান পর্যন্ত উৎপাদন করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতার তুলনায় এখন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ উৎপাদন হচ্ছে। মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে অবস্থান করা বাঁশখালীর এফবি সোনাবানু ট্রলারের মাঝি সায়েদ মিয়া বলেন, একটি ট্রলারে সাগরে যাওয়ার জন্য ১৫০ থেকে ২০০ ক্যান বরফ প্রয়োজন হয়। কিন্তু পাঁচ দিন ধরে ঘাটে অবস্থান করেও এক ক্যান বরফ পাননি তিনি।
সায়েদ মিয়া বলেন, ‘কয়েকটি বরফ কলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। বেশি দামে ৫০ থেকে ৬০ ক্যান বরফ দিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু এত কম বরফ দিয়ে তো ট্রিপ দেওয়া সম্ভব নয়। কবে চাহিদামতো বরফ পাব, সেটাও নিশ্চিত নয়।’
আলীপুর মৎস্য বন্দরে নোঙর করে থাকা এফবি নুরজাহান ট্রলারের মালিক মিজান হোসেন বলেন, সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার অন্যতম প্রধান উপকরণ বরফ। কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে বরফ না পাওয়ায় ট্রলার ঘাটে পড়ে আছে।
তিনি বলেন, ‘এখন ইলিশের ভরা মৌসুম। অথচ আমাদের ঘাটে বসে অলস সময় কাটাতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ট্রলার মালিকদের লোকসান আরও বাড়বে।’ বরফ সংকটের কারণে মৎস্য ব্যবসায়ীদেরও বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। আলীপুরের খান ফিশের আড়তের স্বত্বাধিকারী রহিম খান বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বরফের পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, ‘১৫০ টাকার বরফ এখন ৩০০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। তাও চাহিদামতো পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে খুলনা, বাগেরহাট ও বরিশাল থেকে ট্রাকে করে বরফ আনতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত খরচের পাশাপাশি সময়ও নষ্ট হচ্ছে।’
মৎস্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ইলিশের মৌসুমে প্রতিদিন শত শত ট্রলার সাগরে যায়। ট্রলারগুলোতে মাছ সংরক্ষণের জন্য বিপুল পরিমাণ বরফ প্রয়োজন হয়। বরফের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এর প্রভাব পড়বে মাছ আহরণ ও বাজারজাতকরণে। একই সঙ্গে ক্ষতির মুখে পড়বেন জেলে, ট্রলার মালিক, আড়তদার ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে পটুয়াখালী পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার আবুল কাশেম বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বর্তমানে জেলায় লোডশেডিং চলছে।
তিনি জানান, পটুয়াখালীতে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৩০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৮৫ মেগাওয়াট। ফলে ৪৫ মেগাওয়াট ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে চাহিদার প্রায় ৫২ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে এবং ঘাটতি পূরণে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
আবুল কাশেম বলেন, জ্বালানি সংকট কেটে গেলে এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু হলে লোডশেডিং পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তবে মৎস্য ব্যবসায়ী ও ট্রলার মালিকদের দাবি, ইলিশের এই গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমে অন্তত মহিপুর ও আলীপুর মৎস্য বন্দরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বরফ সংকট আরও তীব্র হতে পারে। এতে সাগরে মাছ ধরার ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ার পাশাপাশি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন মৎস্যজীবীরা।