সামিটের এলএনজি সরবরাহ শুরু, গ্যাস সংকট কমার আশা

নিজস্ব প্রতিবেদক
| আপডেট: ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:১৯ পিএম | প্রকাশ: ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:১৯ পিএম
সামিটের এলএনজি সরবরাহ শুরু, গ্যাস সংকট কমার আশা
ছবি: সংগৃহীত

চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে আবারও সরবরাহ শুরু করেছে সামিট এলএনজি টার্মিনাল। বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে বন্ধ থাকার পর শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে টার্মিনালটি প্রায় ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) পুনঃগ্যাসীকৃত এলএনজি (আরএলএনজি) সরবরাহ শুরু করে। ধাপে ধাপে সরবরাহ বাড়িয়ে শনিবার (১৫ আগস্ট) রাত ২টার দিকে প্রায় ৫৫০ এমএমসিএফডি পর্যন্ত নেওয়ার লক্ষ্য জানিয়েছে সামিট।

সামিটের সরবরাহ বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের মোট সরবরাহ প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুটে নেমে গিয়েছিল। শুক্রবার সন্ধ্যায় সরবরাহ পুনরায় শুরু হওয়ায় আপাতত সেই ঘাটতি কিছুটা কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে। শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের প্রাপ্যতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

সামিট এলএনজি জানিয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিট থেকে দৈনিক প্রায় ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে সরবরাহ বাড়ানো হবে। টার্মিনালের স্বাভাবিক সক্ষমতা প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট হলেও শুক্রবার সামিট সর্বোচ্চ প্রায় ৫৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহের লক্ষ্য জানিয়েছে।

সামিটের বাড়তি সরবরাহের ফলে জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায় গ্যাসের জোগান বাড়লে উৎপাদন পরিস্থিতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

সামিট জানিয়েছে, টার্মিনাল ও জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থার কারিগরি সক্ষমতার মধ্যে থেকে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্যভাবে সর্বোচ্চ গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে তারা কাজ করছে। বাংলাদেশের শিল্পোন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। গ্যাস সংকট মোকাবিলা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেট্রোবাংলা ও সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার কথা জানিয়েছে সামিট।

সংকটের শুরু যেভাবে

দেশে আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের সক্ষমতা দিনে প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট। সামিটের টার্মিনালের স্বাভাবিক সক্ষমতা প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট।

গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে টার্মিনালটির গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা কমে যায়। ফলে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রে সামিটের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়।

একপর্যায়ে সামিটের টার্মিনাল থেকে দিনে ৫৬ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। পরে তা প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুটে রাখা হয়। চলতি সপ্তাহের শুরুতে এলএনজি নিয়ে একটি কার্গো বঙ্গোপসাগরে পৌঁছালেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেটি টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে নতুন কার্গো থেকে এলএনজি নেওয়া যায়নি।

টার্মিনালে মজুত থাকা এলএনজি দিয়ে সরবরাহ চালিয়ে যায় সামিট। মজুত দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়া ঠেকাতে সোমবার সন্ধ্যা থেকে সরবরাহ কমানো হয়। মঙ্গলবার তা ২০ কোটি ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়। বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হচ্ছিল ১০ কোটি ঘনফুট করে। বৃহস্পতিবার বিকেলে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

এর ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের মোট সরবরাহ প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। এর আগের দিন বুধবার সরবরাহ ছিল প্রায় ২০৩ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে দেশে ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে এলএনজি থেকে আসে প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস বাড়লেও শিল্পে সংকট

গ্যাসের মোট সরবরাহ কমে যাওয়ার পরও বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে এ খাতে গ্যাসের জোগান বাড়ানো হয়েছে। আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দিনে প্রায় ৬৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস পেত। এখন দেওয়া হচ্ছে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট। সার উৎপাদনে যাচ্ছে ১৪ কোটি ঘনফুট।

অন্যদিকে শিল্প, বাসাবাড়ি ও অন্যান্য খাতে মিলিয়ে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ৮৫ কোটি ঘনফুট। তিন সপ্তাহ আগেও এসব খাতে ১৬০ থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো।

ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরে রাখার চেষ্টা করা হলেও শিল্প খাতে গ্যাসের সংকট আরও তীব্র হয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎসংকটে কারখানাগুলোর উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ।

গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ ঘাটতিও ছিল

গ্যাসের সংকটের প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনেও পড়েছে। শুক্রবার রাত ও ভোরে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি ছিল।

পাওয়ার গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাত ১টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৯২৪ মেগাওয়াট। সরবরাহ হয়েছে ১৪ হাজার ২৮০ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৬৪৪ মেগাওয়াট।

রাত ২টায় ১৫ হাজার ৭১৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হয় ১৩ হাজার ৯১০ মেগাওয়াট। তখন ঘাটতি দাঁড়ায় ১ হাজার ৮০৯ মেগাওয়াট। রাত ৩টায় ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৭৭৩ মেগাওয়াট এবং ভোর ৪টায় ১ হাজার ৭২৮ মেগাওয়াট। ভোর ৫টায় ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট।

সকালে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। সকাল ৬টায় বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ৬০৯ মেগাওয়াট, সকাল ৭টায় ৩০৪ মেগাওয়াট। সকাল ৮টায় তা ১৮৫ মেগাওয়াট এবং সকাল ৯টায় ১৬৯ মেগাওয়াটে নেমে আসে।

সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চাহিদা ও সরবরাহ প্রায় সমান ছিল। দুপুর ১টায় ১৪ হাজার ৪৬৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হয় ১৪ হাজার ৪১৪ মেগাওয়াট, ঘাটতি ছিল ৫২ মেগাওয়াট। দুপুর ২টায় ঘাটতি নেমে আসে ২২ মেগাওয়াটে।

সামিটের গ্যাস সরবরাহ ধাপে ধাপে বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের জোগান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এতে আগামী দিনগুলোতে বিদ্যুতের ঘাটতির চাপও কমতে পারে।

পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে

সামিটের সরবরাহ শুরু হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের ঘাটতি কিছুটা কমার সম্ভাবনা তৈরি হলেও এতে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে না। কারণ এক্সিলারেট এনার্জির ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হয়নি।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, এক্সিলারেটের টার্মিনালে দুটি বয়লার রয়েছে। প্রতিটির সক্ষমতা দিনে ৩০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে একটি বয়লার অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অক্ষত বয়লারটি থেকে ৬ আগস্ট গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি চালুর প্রস্তুতি চলছে।

পূর্ণ সক্ষমতায় চালুর আগে ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটির প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। ওই সময়ে টার্মিনাল থেকে টানা ৭২ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হবে। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা কবে শুরু হবে, তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

ফলে সামিটের সরবরাহ বাড়ায় আপাতত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে কিছুটা স্বস্তির সম্ভাবনা তৈরি হলেও দুটি এলএনজি টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় না ফেরা পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ কম।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে