নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করলে সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী শহীদ ফারুক সড়কে এনসিপি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আয়োজিত গণসমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব এবং বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধের দাবিতে এ সমাবেশ আয়োজন করা হয়।
নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের পরিবর্তন ও সংস্কারের জন্য গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তাঁরা নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। জনগণকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল, যাতে পুলিশ, বিচারব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার করা যায়।
তিনি বলেন, “সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই সরকার যদি গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করে, আমরা এই সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেব না।”
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রসঙ্গ টেনে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, সরকার গ্যাস সরবরাহ ও দাম কমাতে না পারলে, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে এবং এর কারণে কলকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে জনগণ তা মেনে নেবে না। তাঁর অভিযোগ, চাঁদাবাজির কারণেও ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা করতে পারছেন না।
নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর দাবি, দেশে লোডশেডিংয়ের রেকর্ড হয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকলেও গ্রাহকদের বাড়িতে ‘ভুতুড়ে বিল’ আসছে। একই সঙ্গে গ্যাস ও তেলের দাম বেড়েছে এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “২০০১ সালের পর আমরা লোডশেডিংয়ের পরিস্থিতি দেখেছি। খাম্বা ছিল, কিন্তু বিদ্যুৎ ছিল না। আজকে আমরা আবার একই রকম পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছি। দেশে বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই, জ্বালানি নেই। অথচ বিদ্যুৎ বিল আসছে, গ্যাসের দাম বাড়ছে, তেলের দাম বাড়ছে।”
জ্বালানি খাতের বেসরকারীকরণেরও সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, একটি বেসরকারি কোম্পানির হাতে দেশের তেলের নিয়ন্ত্রণ, বাজারজাত ও আমদানির দায়িত্ব তুলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এভাবে দেশের সম্পদ বড় ব্যবসায়ী ও দুর্নীতিবাজদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
বিএনপির সরকারের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, “এই সরকার জনগণের সরকার নয়, এই সরকার বড় বড় দুর্নীতিবাজ ও মাফিয়া ব্যবসায়ীদের সরকার।”
ব্যাংক লুট ও ঋণখেলাপির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের কেউ কেউ সংসদ ও মন্ত্রণালয়ে জায়গা পেয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন থেকে স্থানীয় সরকার পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক বসিয়ে দুর্নীতি ও লুটপাট চালানোর অভিযোগ তোলেন নাহিদ। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহার করে নিজেদের নির্বাচনী প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর অভিযোগ, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বদলে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী এবং তাঁদের ‘সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ বাহিনী’ এসব সুবিধা পাচ্ছে। এ নিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ এবং তাঁদের মারধরের অভিযোগও করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “জনগণ এই সরকারকে লাল কার্ড দেখিয়ে দেবে। আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও দেখিয়ে দেবে, নির্বাচনে দেখিয়ে দেবে এবং সামনে যে আন্দোলন আসছে, সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়েও দেখিয়ে দেবে।”
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের ভোটে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে দুর্নীতি ও লুটপাটের জন্য নয়। তেল-গ্যাস সংগ্রহ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
যাত্রাবাড়ীর বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কথাও তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, যাত্রাবাড়ীর মানুষ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটে ভুগছেন। অথচ গণ-অভ্যুত্থানে যাত্রাবাড়ী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘হটস্পট’ ছিল।
সমাবেশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্য এবং অভ্যুত্থানের যোদ্ধাদের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, তাঁদের জন্যই বিচার ও সংস্কার প্রয়োজন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের বিচার এখনো নিশ্চিত হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, “আমরা সংস্কার চাই এবং বিচারও চাই। সংস্কার ও বিচার ছাড়া এই সরকারের কোনো ম্যান্ডেট নেই বলে আমরা মনে করি।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিচার কার্যক্রম যতটুকু এগিয়েছিল, এরপর আর তেমন অগ্রগতি হয়নি বলেও দাবি করেন নাহিদ ইসলাম।
ভারত সফর প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর অভিযোগ, শেখ হাসিনা প্রেস কনফারেন্স করে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এর জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর জনগণ মেনে নেবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত এসেছে, দেশের গণতন্ত্র ও বিচারব্যবস্থার ওপর আঘাত এসেছে। সরকার একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়া ছাড়া আর কিছু করতে পারেনি। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে তারেক রহমানের ভারত সফর এ দেশের জনগণ কোনোভাবেই মেনে নেবে না।”
তিনি আরও বলেন, ভারতের সঙ্গে আপস করে নয়াদিল্লি সফর করলে জনগণ মনে করবে, তারেক রহমান খালেদা জিয়া ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ধারক নন। সীমান্ত হত্যা বন্ধের বিষয়েও সরকারের সমালোচনা করেন তিনি।
সমাবেশ থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের বিচার, সংস্কার বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম কমানো এবং চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর দাবি জানানো হয়।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “কীভাবে দাম কমাবেন, সেটা আমরা জানি না। কোনো অজুহাত দেওয়া চলবে না। আপনাদের হয় ক্ষমা চাইতে হবে, নয়তো এসব পণ্যের দাম কমাতে হবে।” নির্বাচনের আগে তেল ও বিদ্যুতের দাম কমানো এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সমাবেশে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, যুগ্ম সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল আমিন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার আহ্বায়ক ইসহাক সরকারসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।