মাত্র তিন কিলোমিটার সড়ক, বদলে যেতে পারে হাজারো মানুষের জীবন

এফএনএস
| আপডেট: ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০৮ পিএম | প্রকাশ: ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০৮ পিএম
মাত্র তিন কিলোমিটার সড়ক, বদলে যেতে পারে হাজারো মানুষের জীবন

উন্নয়নের নানা সূচকে বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প সেই অগ্রগতির দৃশ্যমান প্রতীক। কিন্তু একই সময়ে দেশের কিছু জনপদ এখনো এমন মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত, যা উন্নয়নের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ও ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের তিস্তা চরাঞ্চলের ছয়টি গ্রামের প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার মানুষের জীবনযাত্রা তারই একটি বাস্তব উদাহরণ। মাত্র তিন কিলোমিটার সড়কের অভাবে ইউনিয়ন পরিষদ বা উপজেলা পরিষদে যেতে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রায় ৩০ কিলোমিটার পথ ঘুরে যেতে হয়। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে, বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কখনো নৌকাই একমাত্র ভরসা, আবার পানি কমে গেলে সেই নৌকাও চলাচলের উপযোগী থাকে না। ফলে প্রশাসনিক সেবা গ্রহণ, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা কৃষিপণ্য বাজারজাত-প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। যোগাযোগ সংকটের প্রভাব শুধু যাতায়াতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব, নদীভাঙনে বিদ্যালয় বিলীন হওয়ার ঝুঁকি এবং মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী লেখাপড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। এতে বাল্যবিয়ের মতো সামাজিক সমস্যাও বাড়ছে। অন্যদিকে, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা আরও উদ্বেগজনক। বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য মাত্র একটি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং একজন স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্সেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। অথচ এই চরাঞ্চল কৃষি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। বাদাম, আলু, ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন ও মরিচসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদিত হলেও সুষ্ঠু যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অর্থাৎ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা শুধু জনদুর্ভোগই নয়, স্থানীয় অর্থনীতির সম্ভাবনাকেও বাধাগ্রস্ত করছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ সংকট নিরসনের আশা প্রকাশ করেছেন। তবে বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থেকে মানুষের ন্যূনতম প্রয়োজনকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলিয়ে রাখা সমাধান হতে পারে না। যদি মাত্র তিন কিলোমিটার টেকসই সড়ক নির্মাণে হাজারো মানুষের জীবনমান বদলে যাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা থাকে, তাহলে বিষয়টিকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে বিবেচনা করা উচিত। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ কেবল বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়; বরং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মৌলিক নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিস্তা চরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের এই বঞ্চনা দূর করতে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। উন্নয়নের সুফল তখনই অর্থবহ হবে, যখন দেশের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষও তার ন্যায্য অংশীদার হতে পারবেন।