টাকা নিলেও গবেষণা প্রতিবেদন জমা দিচ্ছে না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) দেড়শতাধিক শিক্ষক। তাতে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার জবাবদিহি, অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং গবেষণা কার্যক্রমের স্বচ্ছতা। কারণ বিগত ৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) অর্থায়নে পরিচালিত অনুমোদিত দেড় শতাধিক গবেষণা প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি এখনো। বরং ঢাবিতে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে গবেষণা প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা না দেয়া। ইউজিসির অর্থায়নে বিগত ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মোট ৪৮২টি গবেষণা প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু তার মধ্যে এখনো জমা পড়েনি ১৫৮ প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদন। ইউজিসি এবং ঢাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সাধারণত ইউজিসির অর্থায়নে পরিচালিত একটি গবেষণা প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর হয়ে থাকে। ওই সময়ের মধ্যে গবেষণা সম্পন্ন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব না হলে গবেষককের আবেদনের ভিত্তিতে সময় বাড়াতে পারে। আর ওই বাড়তি সময়ের মধ্যে গবেষণা সম্পন্ন করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া বাধ্যতামূলক। কারণ গবেষণার চূড়ান— প্রতিবেদন জমা না হলে গবেষণার উদ্দেশ্য ও ফলাফল মূল্যায়ন করা যায় না। পাশাপাশি বরাদ্দ অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হয়েছে কিনা, গবেষণা থেকে নতুন জ্ঞান বা নীতিনির্ধারণে কোনো অবদান এসেছে কিনা ওসব বিষয়ও জানা যায় না। তাতে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার কার্যকারিতা ও সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
সূত্র জানায়, গবেষণার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা না দেয়ার বিষয়টিকে আরো বিতর্কিত করে তুলেছে ঢাবি প্রশাসন। কারণ নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও যেসব শিক্ষক গবেষণার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি, তাদের নাম প্রকাশে প্রশাসন আগ্রহী নয়। কারণ টাকা নিয়েও গবেষণা প্রতিবেদন জমা না দেয়া গবেষকদের তালিকায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক উপাচার্য, উচ্চ পদে দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষক এবং প্রভাবশালী শিক্ষাবিদদের নাম রয়েছে। তবে অনেকের মতে, যেসব শিক্ষক গবেষণার টাকা নিয়ে প্রতিবেদন দেননি তাদের আইনের আওতায় আনা দরকার। কারণ গবেষণার জন্য সরকারি কোষাগারের টাকা নিয়ে প্রতিবেদন জমা না দেয়া অপরাধ। এর সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন।
সূত্র আরো জানায়, গবেষণার দায়িত্ব নেয়ার পরও অনেক শিক্ষক গবেষণার চেয়েও বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন প্রশাসনিক পদ ও পদবিতে। ফলে গবেষণার চর্চা ব্যাহত হয়। অথচ ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত গবেষণা প্রকল্পের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও পরবর্তী দুই অর্থবছরে গবেষণা অনুদানের পরিমাণ ও প্রকল্প সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ওই সময়ে একটি গবেষণা প্রকল্পে সর্বনিম্ন সাড়ে ৩ লাখ এবং সর্বোচ্চ প্রায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু কী গবেষণা হয়েছে তার কোনো প্রতিবেদনই ১৫৮ শিক্ষক জমা দেয়নি। যদিও ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ইউজিসির অর্থায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ৪৮২টি গবেষণা প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। তার মধ্যে ৩২৪ প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা পড়লেও এখনো জমা পড়েনি বাকি ১৫৮ প্রকল্পের প্রতিবেদন। যা মোট অনুমোদিত প্রকল্পের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তার পেছনে ব্যয়িত টাকার অংকের পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও ৯৮টি গবেষণা প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
এদিকে শিক্ষকদের মতে, গবেষণা প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা না পড়া প্রশ্নবিদ্ধ করছে গবেষণা কার্যক্রমের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার। ফলে ভবিষ্যতে গবেষণা অনুদান অনুমোদন ও নতুন প্রকল্প মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরির আশঙ্কা থাকে। যদিও ইউজিসির নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা গবেষকের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব।
অন্যদিকে এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত গবেষণা তহবিলের বরাদ্দ, অর্থের ব্যবহার, চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা এবং জবাবদিহির পুরো বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য পৃথক তদন— কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতীতে অনেক গবেষণা প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হলেও কিছুর চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও প্রয়োজনীয় আর্থিক নথিপত্র পাওয়া যাচ্ছে না। ওসব বিষয় স্বচ্ছভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার লক্ষ্যেই তদন্ত পরিচালিত হবে।
এ প্রসঙ্গে ইউজিসির রিসার্চ গ্রান্টস অ্যান্ড অ্যাওয়ার্ড ডিভিশনের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. ওমর ফারুখ জানান, একটি গবেষণা প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ সাধারণত এক বছর। তবে বিভিন্ন কারণে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি সময় লাগে। কোনো শিক্ষক নির্ধারিত সময়ে গবেষণা সম্পন্ন করতে না পারলে বা প্রকল্প শেষ করতে ব্যর্থ হলে সেক্ষেত্রে অর্থ ফেরতের একটি বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া রয়েছে। সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুসারেই বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়।