পুলিশ প্রশাসনে বাড়ছে অসন্তোষ

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:১২ এএম
পুলিশ প্রশাসনে বাড়ছে অসন্তোষ

নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে মাঠপর্যায়ে পুলিশ প্রশাসনে অস্থিরতা ও অসন্তোষ বাড়ছে। বিশেষ করে পদায়ন বাণিজ্য নিয়ে পেশাদার পুলিশ সদস্যরা খুবই হতাশ ও ক্ষুব্ধ। ফলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে তার বিরূপ প্রভাব পড়ছে। পরিস্থিতি উত্তরণে পুলিশ প্রশাসনে বদলি বাণিজ্য জিরো টলারেন্সসহ পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাকে অন্যতম মাপকাঠি হিসাবে বিবেচনায় নিতে হবে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই তা জরুরি। তা নাহলে পুলিশের কোনো অংশ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে দায়িত্বে অবহেলা করে তাহলে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো নাজুক হওয়ার শঙ্কা থাকে। পুলিশ প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও পুলিশ প্রশাসনে এখনো ফিরে আসেনি স্বস্তি। বরং তৈরি হচ্ছে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। সেক্ষেত্রে সবার আগে বন্ধ করতে হবে বদলি বাণিজ্য। তা নাহলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। অর্থের বিনিময়ে পদায়ন হলে কর্মকর্তারা স্বাভাবিকভাবেই আইন-শৃৃঙ্খলার চেয়ে বিনিয়োগ তোলার দিকেই নজর দেবে বেশি। এমনিতেই বর্তমান পুলিশ প্রশাসন এখনো বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে শুরু হওয়া মব কালচার দমনে পুলিশ কার্যকর কোনো ভূমিকা পালন করতে পারছে না। আর এখন দেশে যদি বড় ধরনের আন্দোলন বা শোডাউন হলে তা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে চরম বেগ পেতে হবে। 

সূত্র জানায়, উপযুক্ত কর্মকর্তাদের সংক্ষিপ্ত তালিকা বা ফিট লিস্ট অনুসরণ করে পুলিশ প্রশাসনে পদোন্নতি-পদায়ন হচ্ছে না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংবেদনশীল স্থানগুলো, যথাক্রমে জেলার এসপি, রেঞ্জ ডিআইজি এবং থানার ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) পদের মতো স্থানগুলোতে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পদায়ন হওয়ার অভিযোগ উঠছে। তাছাড়া অতিরিক্ত আইজিপি পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ (বিশেষ করে ইউনিট প্রধান) পদগুলোও অর্থ ও তদবিরের বিনিময়ে বণ্টন করা হওয়ার গুঞ্জন রয়েছে। পুলিশ সুপারদের (এসপি) জন্য ৬৪টি জেলাসহ প্রায় ১০০টি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা রয়েছে। কিন্তু বাহিনীতে এসপির সংখ্যা ৭০০-এর বেশি। নিয়মানুযায়ী ব্যাচভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে ফিট লিস্ট তৈরি করে পদায়ন করার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। বরং নানামুখী তদবিরের জোরে নিচের দিকে থাকা অযোগ্য বা তোষামোদকারী অফিসাররা গুরুত্বপূর্ণ পদে পোস্টিং পেয়ে যাচ্ছে। আবার কখনো দ্রুত প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ওসব ঘটনায় পুলিশ বাহিনীতে ফেলছে নেতিবাচক প্রভাব। ফলে অনেকের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। ইতিপূর্বে পুলিশ প্রশাসনে রাজনৈতিক অজুহাতে অনেক কর্মকর্তাই প্রাপ্য পদোন্নতি পায়নি। আর এখন পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে চলছে বাণিজ্য। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সহকর্মীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে অনেক ভালো অফিসারকে রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে জোরপূর্বক বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠনো হয়েছে। অথচা ওসব কর্মকর্তারা অভিজ্ঞ ও দক্ষ ছিলো। পেশাগত জীবনে তাদের সাফল্য ও সততা সর্বজনবিদিত ছিল। কোনো সুনির্দিষ্ট বা বড় ধরনের অভিযোগ ছাড়া একের পর এক জ্যেষ্ঠ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের অবসরে পাঠানোর কারণেও পুলিশের বিভিন্ন স্তরে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ। তাতে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের স্পৃহা ও পেশাদারিত্ব।

সূত্র আরো জানায়, পুলিশ প্রশাসনে নিয়োগ ও পদোন্নতি বিধিমালার (পিআরবি) ইচ্ছামতো সংশোধনেই পুলিশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়ছে। ৪ হাজার নতুন এএসআই পদ মঞ্জুরের ক্ষেত্রে ৫০ ভাগ বিভাগীয় প্রমোশন ও ৫০ ভাগ সরাসরি নিয়োগের নিয়ম মানা হয়। কিন্তু সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। বরং পিআরবি সংশোধন করে এসআই পদে সরাসরি নিয়োগের প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। ফলে রুদ্ধ হয়ে গেছে দীর্ঘদিন ধরে যোগ্যতার ভিত্তিতে এএসআই থেকে এসআই হওয়ার অপেক্ষায় থাকা বিভাগীয় কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথ। তাতে মাঠপর্যায়ে চরম অসন্তোষ বেড়েছে। ফলে পুলিশের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি অধস্তনদের আস্থা কমে যাচ্ছে। অধস্তনরা নিজের দায় নিয়ে কাজ করতে ভয় পাচ্ছে। পুলিশের মতো একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর অভ্যন্তরে এভাবে ক্ষোভ, অনিয়ম, ঘুষবাণিজ্য এবং পদায়ন নিয়ে বিশৃঙ্খলা চললে কখনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি সম্ভব নয়। 

এদিকে এসব বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (অ্যাডমিন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে তার কোনো সত্যতা নেই। বর্তমান আইজিপির বিরুদ্ধে পুলিশের ভেতরে একটি গ্রুপ সক্রিয় আছে। তারা নানা ধরনের অপতথ্য ছড়াচ্ছে।