কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলস-এর উদ্যোগে “নিরাপদ কর্মপরিবেশে: সবাই মিলে সবার জন্য” শীর্ষক এই সেমিনার আজ সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে বিলসের “বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মক্ষেত্র পরিস্থিতি” শীর্ষক সংবাদপত্রভিত্তিক জরিপ-২০২৫ ও জানুয়ারি–মার্চ ২০২৬ এর তথ্য তুলে ধরা হয়। জরিপে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় অন্তত ১৮৬ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ২০২৫ সালে মোট ৭৩৫ জন শ্রমিক নিহত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। বিলস-এর চেয়ারম্যান মোঃ মজিবুর রহমান ভুঞাঁর সভাপতিত্বে এবং বিলস-এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদের সঞ্চালনায় আয়োজিত এই সেমিনারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ, শিল্প ও মালিকপক্ষের নেতৃবৃন্দ, গবেষক, শিক্ষাবিদ, মানবাধিকার কর্মী এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। বক্তারা কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় বিদ্যমান অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন এবং একটি টেকসই ও মানবিক কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে কার্যকর নীতি ও বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিলস পরিচালিত জরিপের তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারী-মার্চ ২০২৬ সময়কালে কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় যে ১৮৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়, তার মধ্যে ১৮৫ জন পুরুষ এবং ১ জন নারী শ্রমিক। সর্বোচ্চ ১০৭ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় পরিবহন খাতে। এছাড়াও কৃষি খাতে ১৯ জন, নির্মাণ খাতে ১৪ জন, প্রবাসী শ্রমিক ১১ জন, দিন মজুর ১১ জন, মৎস্য খাতে ৯ জন, বিদ্যুৎ খাতে ৬ জন এবং অন্যান্য খাতে ৯ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ২০২৬ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ৩৩৫ জন শ্রমিক আহত হন, যার মধ্যে ৩১৯ জন পুরুষ এবং ১৬ জন নারী শ্রমিক। সর্বোচ্চ পোশাক খাতে ২৫০ জন শ্রমিক আহত হন। এ ছাড়া ১২ জন ওয়ার্কশপ শ্রমিক, ১০ জন পরিবহন শ্রমিক, ৯ জন মৎস্য শ্রমিক, ৯ জন পাদুকাশিল্প শ্রমিক, ৮ জন স্টিল মিল শ্রমিক, ৭ জন নির্মাণ শ্রমিক ও ৭ জন হোটেল-রেস্তোরা শ্রমিক আহত হন। এছাড়া অন্যান্য খাতে ২৩ জন শ্রমিক আহত হন। এ ছাড়া ২০২৫ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় যে ৭৩৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়, তারে মধ্যে ৭৩১ জন পুরুষ এবং ৪ জন নারী শ্রমিক। খাত অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি ৪৩৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় পরিবহন খাতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৩ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় কৃষি খাতে। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৬৭ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় নির্মাণ খাতে। এছাড়া মৎস্য শ্রমিক ৩৫ জন, দিনমজুর ৩২ জন, বিদ্যুৎ খাতে ১৫ জন, প্রবাসী শ্রমিক ১২ জন, নৌপরিবহন খাতে ১১ জন, তৈরি পোশাক খাতে ৬ জন, টেক্সটাইল খাতে ৪ জন, এবং অন্যান্য খাতে ৩৮ জন শ্রমিক নিহত হন। জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প ৪ জন শ্রমিক নিহত হন। সেমিনারে চারটি প্যানেল আলোচনায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করা হয়। “শিল্প কারখানায় সেফটি কমিটির ভূমিকা, চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণে করণীয়” শীর্ষক অধিবেশনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোস্তাফিজ আহমেদ, “শিল্প কারখানায় সেফটি গভর্ন্যান্স ও কেমিক্যাল ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ” বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ নীতি বিশেষজ্ঞ মঈন উদ্দীন আহমেদ, “নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও টেকসই নগরায়ণ: রানা প্লাজা সহ সাম্প্রতিক কারখানাসমূহের দুর্ঘটনা থেকে অভিজ্ঞতা” বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান এবং “আইএলও কনভেনশন ১৫৫ ও ১৮৭ অনুসসমূহ পরবর্তী বাস্তবায়নসহ সাম্প্রতিক শ্রম আইন সংশোধনের প্রেক্ষিতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ সুরক্ষায় শ্রমিক পক্ষের ভূমিকা” বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন একেএম মাসুম উল আলম। এতে আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন শ্রমিক অধিকার জাতীয় অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্সের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-আহ্বায়ক মেজবাউদ্দিন আহমেদ, বিলস উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য বাদল খান ও নইমুল আহসান জুয়েল, বিলস নির্বাহী পরিষদ সম্পাদক সাকিল আখতার চৌধুরী ও শামীম আরা, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন, সলিডারিটি সেন্টার বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর এডভোকেট এ.কে.এম নাসিম, স্কপের যুগ্ম-সমন্বয়কারী এএএম ফয়েজ হোসেন, বিইএফ এর এডিশনাল সেক্রেটারি জেনারেল সাইদুল ইসলাম, আইবিসি সভাপতি কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক বাবুল আক্তার, সেফটি এন্ড রাইটস এর নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রচার সম্পাদক মশিউর ইসলাম মঞ্জু, কর্মজীবী নারীর নির্বাহী পরিচালক সানজিদা সুলতানা প্রমুখ। বক্তারা উল্লেখ করেন যে, রানা প্লাজা ট্রাজেডি-এর পর কর্মক্ষেত্র নিরাপত্তা ইস্যুতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তৈরি পোশাক খাতে ভবন ও অগ্নি নিরাপত্তায় উন্নয়ন, শ্রম আইন সংশোধন এবং আন্তর্জাতিক নজরদারি বৃদ্ধি পেলেও অনানুষ্ঠানিক খাতের অধিকাংশ শ্রমিক এখনো নিরাপত্তা সুরক্ষার বাইরে। এছাড়া কার্যকর সেফটি কমিটির অভাব, সীমিত পরিদর্শন ব্যবস্থা, নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশের ঘাটতি এবং মনোসামাজিক ঝুঁকির বিষয়টি এখনো উপেক্ষিত। সেমিনারে শিল্প কারখানায় সেফটি কমিটির কার্যকারিতা, কেমিক্যাল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ নগরায়ন, এবং আইএলও কনভেনশন ১৫৫ ও ১৮৭ বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, শুধুমাত্র কমপ্লায়েন্স-নির্ভর নয়, বরং সংস্কৃতি-নির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা একটি প্রাতিষ্ঠানিক চর্চায় পরিণত হয়। বক্তারা আরও জোর দিয়ে বলেন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, মালিকপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে প্রমাণভিত্তিক গবেষণা, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং অংশীজনদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে নীতি সংস্কার ও বাস্তবায়নে গতি আনা সম্ভব। অংশগ্রহণকারীরা শ্রম আইন বাস্তবায়ন জোরদার, পরিদর্শন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বাস্তবধর্মী উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এই সেমিনারের অন্যতম প্রধান অর্জন ছিল কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা জোরদার এবং নীতি বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপ পরিচালনার জন্য একটি সহযোগিতামূলক ‘যৌথ কৌশল’ প্রণয়নের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো। সেমিনারে জোর দিয়ে বলা হয় যে, উপস্থাপিত তথ্য, গবেষণালব্ধ ফলাফল এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো কার্যকরভাবে প্রচার করা হলে শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ন, নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সচেতনতা, অংশগ্রহণ ও সমন্বয় বৃদ্ধি পাবে, যা বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে। অনুষ্ঠানে উপস্থাপনাসমূহের উপর মতবিনিময় ও সুপারিশ প্রদান করেন আইএলও এর লেবার এডমিনিস্ট্রেশন ও ওয়ার্কিং কন্ডিশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার নিরান রামজুথান, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যুগ্ম-মহাপরিদর্শক মোঃ মাহফুজুর রহমান ভূইয়া ও মোঃ মতিউর রহমান এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) আলী আহাম্মেদ খান ও ঢাকা দক্ষিণের জোন কমান্ডার ফয়সালুর রহমান। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন। উল্লেখ্য, প্রতি বছর ২৮ এপ্রিল “জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা দিবস” পালন করা হয়ে থাকে, যার মূল লক্ষ্য হলো পেশাগত রোগ ও কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বৈশ্বিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এ ছাড়া প্রতি বছর এই দিন বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক শ্রমিক স্মরণ দিবস (কোমেমোরেশন ডে) পালিত হয় কর্মক্ষেত্রে পেশাগত দুর্ঘটনা বা রোগে নিহত শ্রমিকদের স্মরণ করা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে। ২০২৬ সালে এই দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল “মনোসামাজিকভাবে স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ”।