সকারের অর্পিত দায়িত্ব পালন করাটা আমাদের কর্তব্য। তাই দেশের সম্পদ রক্ষায় পরিবার পরিজন ছাড়াই ঈদের দিনটাও কাটাতে হয়েছে গহীন সুন্দরবনে। ইট পাথরের শহর আর গ্রামগঞ্জের সেই ঈদের আনন্দ টুকু উপভোগ করতে না পেরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লিলাভুমি বিশ্বের ঐতিহ্য সুন্দরবন রক্ষায় ঈদের দিনেও টহল কার্যক্রম করার পরেও আমরা খুশি। মলিন চেহারায় এমন কথাগুলো বলছিলেন সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের অধিনস্থ হায়াতখালী বন টহল ফাঁড়ির বন রক্ষী মোঃ আঃ গফফার। শুধু আঃ গফফার নয় এমন ভাবে ঈদের দিনটি কেটে গেছে সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের প্রায় ৩ শতাধিক বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। তারা পরিবার পরিজন ছাড়াই নির্জন পরিবেশে ঈদের দিনটি কাটিয়েছি। অতন্ত্র প্রহরী বন পাহারায় দিন রাত কাজ করলেও আধুনিক যুগের কোন সুবিধা নেই তাদের। তাই ঈদের দিনে সরকারের কাছে তাদের প্রত্যাশা অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যায় তারা যেন সকল সুযোগ সুবিধা পায়। বন বিভাগ সুত্রে জানা গেছে এ বছর বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া সীমিত করা হয়েছে সুন্দরবন রক্ষায় নিয়োজিত বনকর্মীদের ঈদের ছুটি। এ ছাড়া সবাইকে কর্মস্থলে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরিফুল ইসলাম জানান, সুন্দরবনে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। হরিণ ও বন্যপ্রাণী শিকার এবং অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সীমিত করা হয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঈদের ছুটি। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ছুটি দেওয়া হয়নি। বন কর্মীদের পরিবার ছাড়া ঈদ কাটাতে হয়েছে। ঈদের বিশেষ এ সময়টাতে শিকারিদের অপতৎপরতা বন্ধ এবং অগ্নি সন্ত্রাসীদের নাশকতারোধে রেঞ্জের সব স্টেশন ও টহল ফাঁড়ির কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নজরদারি বাড়াতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া ঈদের পুর্বে ও পরবর্তিতে বিশেষ টহল কার্যক্রম পরিচালনারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই মোতাবেক সুন্দরবনের সম্পদ রক্ষায় দিন রাত কাজ করছে বন বিভাগের স্টাফরা। ঈদের দিন সকালে সুন্দরবন সংলগ্ন কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, ঈদের ছুটিতে বাড়িতে না গিয়ে পরিবার-পরিজন ছেড়ে সুন্দরবন রক্ষায় কাজ করছেন বনরক্ষীরা। ঐ ফরেস্ট স্টেশনের বন কর্মী মোঃ নজরুল ইসলাম জানান, সুন্দরবনের চাকরিতে প্রায় ঈদেই ছুটি মেলে না। বিশেষ করে রোজার ঈদে তারা বাড়িতে যেতে পারেন না। পরিবার ছাড়া ঈদ করা খুবই কষ্টের। তবে মানিয়ে নিতে হয়। এক সময় খারাপ লাগত। এখন আর খারাপ লাগে না। এ বন কর্মী আক্ষেপ করে বলেন, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। কিন্তু শুধু বন বিভাগ সব ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। দুর্গম ও ভয়ংকর বনাঞ্চলে বনপ্রহরীদের সব সময় জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করতে হয়। বেতন ছাড়া অন্য তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। তিনি বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রেশন ও ঝুঁকি ভাতা প্রদানের দাবি জানান সরকারের কাছে। সুন্দরবনের গেওয়াখালী বন টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ জামাল হোসেন বলেন, আমি সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জে প্রায় ১ যুগ ধরে আছি। এর মধ্যে একবার মাত্র পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে পেরেছি। গত বছর ঈদের সময় সুন্দরবনের এখানেই কর্মরত ছিলাম। গহীন বনের এই এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কও সমস্যা রয়েছে। ঈদের দিন আমরা কয়েকজন স্টাফ মিলে একটা ব্রয়লার মুরগি আর একটু সেমাই রান্না করার ব্যবস্থা করেছি। তাতে খুশি। সুন্দরবনের শিবসা টহল ফাঁড়ির দায়িত্বরত কর্মকর্তা মোঃ রবিউল ইসলাম বলেন, ঈদে পরিবার-প্রিয়জন নিয়ে সবাই যখন আনন্দ উপভোগ করছে, ঠিক এ সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে আমরা (বনকর্মীরা) অবস্থান করছি নির্জন সুন্দরবনে। নলিয়ান স্টেশন কর্মকর্তা মোঃ ইসমাই হোসেন বলেন, বিশ্বের ঐতিহ্য সুন্দরবন রক্ষায় বন বিভাগের স্টাফদের সকল সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের (ডিএফও) এজেডএম হাছানুর রহমান বলেন, আসলে বন বিভাগের স্টাফরা অনেক কষ্ট করে সুন্দরবনের সম্পদ রক্ষায় নিরোলশভাবে কাজ করে থাকে। তাদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার।