রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ‘বর্ষা বিপ্লবের গান’ কনসার্টে মঞ্চে গান গাওয়ার সময় আর্ক ব্যান্ডের গায়ক হাসানের মুখে পানির বোতল ছোড়ার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছেন আয়োজকেরা। এ ঘটনায় সংগীতাঙ্গনে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিবাদ দেখা দিলেও বিষয়টিকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখছেন হাসান। তবে তাঁর অনুরোধ, ভবিষ্যতে যেন কোনো শিল্পীকে এমন অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি ও ‘৩৬ জুলাই’ উদ্যাপন উপলক্ষে ৫ আগস্ট রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা এলাকায় ‘বর্ষা বিপ্লবের গান’ শিরোনামে ওই ওপেন এয়ার কনসার্টের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে পারসা, সেজান, কুড়েঘর, আর্বোভাইরাস, এভয়েড রাফা, আসিফ আকবর, শিরোনামহীন, আর্ক ও আর্টসেলসহ বেশ কয়েকজন শিল্পী ও ব্যান্ড পারফর্ম করেন।
কনসার্টে ‘এত কষ্ট কেন ভালোবাসায়’ গানটি পরিবেশনের সময় দর্শকদের সারি থেকে একটি পানির বোতল ছুড়ে দেওয়া হয়। বোতলটি হাসানের মুখে আঘাত করে। এতে তিনি কিছুটা হতবাক ও বিব্রত হয়ে গান থামিয়ে দেন। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই আবার গান শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত পারফরম্যান্স চালিয়ে যান।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সংগীতাঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শিল্পী ও সংগীতসংশ্লিষ্ট অনেকেই ঘটনাটির নিন্দা জানান। ব্যান্ডশিল্পীদের সংগঠন বামবাসহ অনেকে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে শাস্তির দাবি করেন। একই সঙ্গে কনসার্টে শিল্পীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আয়োজকদের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
সুরকার ও গীতিকার প্রিন্স মাহমুদও এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি শিল্পীদের জন্য মঞ্চে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করার আহ্বান জানান।
তবে ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে কোনো বিরোধ বা উত্তেজনা বাড়াতে চাননি হাসান। তিনি জানান, দীর্ঘ সংগীতজীবনে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আগে কখনো হননি। তারপরও ঘটনাটিকে তিনি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখছেন।
হাসান বলেন, “এটা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আমি আমার দর্শক-শ্রোতাদের খুব ভালোবাসি। কেউ ভুল করলে করতে পারে। কিন্তু ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখেছি। কিছু মনে করিনি। তবে সবাই এই ঘটনায় কষ্ট পেয়েছে। এ ধরনের ঘটনা যেন অন্য কোনো শিল্পীর সঙ্গে আর না ঘটে।”
তিনি আরও বলেন, ওপেন এয়ার কনসার্টে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। আয়োজকদেরও নানা পরিস্থিতি সামলাতে হয়। তবে মঞ্চে একজন শিল্পীর মুখের দিকে বোতল ছুড়ে মারার ঘটনা তাঁর কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।
হাসানের ভাষায়, “আয়োজকেরা সমস্যায় ছিল। তাদের অনেক ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। ওরা সব সময় আমাকে ঘিরেই ছিল। একটা ভালো প্রোগ্রাম করতে গেলে বাধা আসবেই। ওপেন এয়ার কনসার্টে কিছু বিশৃঙ্খলা হতেই পারে। আগেও অনেক কনসার্টে দেখেছি। কিন্তু এবারের ঘটনা একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল। মুখের ওপর বোতল ছুড়ে মারার মতো ঘটনা আগে হয়নি। বিব্রত হলেও কিছু মনে করিনি।”
এরপরই তিনি নিজের অনুরোধের কথা জানান, “আমার একটাই অনুরোধ, ভবিষ্যতে যেন কারও সঙ্গে এমনটা না হয়।”
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাখ্যা দিয়ে আর্ক ব্যান্ড ও হাসানের কাছে ক্ষমা চেয়েছে কনসার্টের আয়োজক মুনসুন কালচারাল অ্যালায়েন্স। আয়োজকেরা জানান, ঘটনার পরপরই তাঁরা আর্ক ব্যান্ডের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। পাশাপাশি আর্কের ভক্ত, অনুরাগী ও শ্রোতাদের কাছেও দুঃখ প্রকাশ করেন।
নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নিজেদের অবস্থানও ব্যাখ্যা করেছে আয়োজক প্রতিষ্ঠানটি। তাদের দাবি, স্থান ও বিপুল জনসমাগমের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মঞ্চের মূল অংশ নিরাপদ রাখতে তিন স্তরের নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করা হয়েছিল। পুলিশ প্রশাসনের সদস্যদের পাশাপাশি এলিট ফোর্স, বাউন্সার এবং শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত ছিলেন।
আয়োজকদের ভাষ্য, সন্ধ্যার পর একদল উগ্র শ্রোতা নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে মূল অংশে ঢুকে পড়ে। এ সময় তারা পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করে। বিপুল জনসমাগমের মধ্যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় জোর করে তাদের ঠেকানোর পরিবর্তে অনুষ্ঠান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যেই আর্ক ব্যান্ডের সঙ্গে অনভিপ্রেত ঘটনাটি ঘটে।
এ ঘটনায় হাসানের পারফরম্যান্সের প্রশংসাও করেছে আয়োজকেরা। তাঁদের মতে, অপ্রত্যাশিত ঘটনার পরও হাসান দর্শকদের নিরাশ করেননি। শিল্পীসত্তাকে সামনে রেখে তিনি শেষ পর্যন্ত গান চালিয়ে গেছেন।
একই সঙ্গে ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও জানিয়েছে মুনসুন কালচারাল অ্যালায়েন্স। আয়োজকদের বক্তব্য, এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই ছাড় দেওয়ার মতো নয়। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া না হওয়া পর্যন্ত তারা আর কোনো কনসার্ট আয়োজন করবে না বলেও জানিয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও হাসান বিষয়টিকে ব্যক্তিগতভাবে বড় করে দেখছেন না। বরং তাঁর বক্তব্য, শিল্পীদের রাজনৈতিক পরিচয় বা কোনো পক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে বিচার করা উচিত নয়। একজন শিল্পী বিভিন্ন সময়ে সরকারি, বেসরকারি কিংবা রাজনৈতিক আয়োজনে গান গাইতে পারেন। তাই বলে তাঁর প্রতি অসম্মান বা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করা গ্রহণযোগ্য নয়।
হাসানের মতে, শিল্পীরা মানুষের জন্যই গান করেন এবং দর্শকদের কাছ থেকে তাঁরা ভালোবাসা ও সম্মান প্রত্যাশা করেন। তাই কনসার্টে শিল্পীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আয়োজক ও দর্শক সবার দায়িত্ব।