রাজশাহীর তানোর সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ সজীবের বিরুদ্ধে বেপরোয়া ঘুষ ও দুর্নীতির মহোৎসব নিয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন মো. সাকিল আহমেদ (২৫) নামের এক কৃষক। তিনি গত ২ আগস্ট, রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের এমপি, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, জেলা প্রশাসক ও দুর্নীতি দমন কমিশনের রাজশাহী অঞ্চলিক অফিসে ডাকযোগে ও সরাসরি গিয়ে অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
তার পিতার নাম মো. বাবুল হোসেন। বাড়ি তানোর সদরের গোল্লাপাড়া মহল্লায়। এছাড়াও আরেক অভিযোগ করেছেন তানোর পৌর এলাকার জিওল গ্রামের বাসিন্দা তানজিলুর রহমানের পুত্র রুহুল আমিন (২২)। তিনিও গত ২ আগস্ট পৃথক অভিযোগ একই দপ্তরে গিয়ে সরাসরি জমা দিয়েছেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে অভিযোগের ১০দিনেও কোন কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
অভিযোগ ও তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছরে ২৪ ফেব্রুয়ারী ভুক্তভোগী মো. সাকিল আহমেদ তার মাতা গোলেনুর বিবি গং এর গোল্লাপাড়া মৌজায় অবস্থিত তফসিল বর্ণিত সম্পত্তি নামজারির জন্য বিধিমতে অনলাইনে আবেদন করেন। যার আবেদন নম্বর- ৮৫৭২৪৫৩। এরপর মোবাইলে ম্যাসেজ আসে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যোগাযোগ করার জন্য। নামজারি কার্যক্রমের ফাইলের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে তানোর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান সাকিল। তখন মৌখিকভাবে তাদের নামজারির বিবরণ ও আদালতের ডিগ্রির নথিপত্রের কথা শোনেন তানোর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ সজীব। এরপর ফাইলে বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে সরাসরি আড়াই লক্ষ টাকা অবৈধ ঘুষ দাবি করেন তিনি। সরকার নির্ধারিত ফি-এর তোয়াক্কা না করে নামজারি আবেদনের বিপরীতে তার দাবিকৃত টাকা দিতে অস্বীকার করা করা হলে ফাইলে নানা ধরনের ত্রুটি দেখিয়ে আবেদন ফাইল আটকে রাখেন। পরে সাকিল নিরুপাই হয়ে অফিসে গিয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা তানভীরকে দেন। এরপর নামজারির প্রস্তাব পাঠানো হয়। ফলে তানোর উপজেলা ভূমি অফিসের এসিল্যান্ডের অতিরিক্ত দায়িত্বরত উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাঈমা খান গত ৭ এপ্রিল মিউটেশন মামলা নং- ৭১৪৪(৯-১)/২০২৫-২৬ নামজারি আবেদন মঞ্জুর করে দেন। যার প্রস্তাবিত খতিয়ান নং-২০২৬-১০০০০৮, হোল্ডিং-২০২৬-১০০০০৮, তহসিল সিরিয়াল- ১৪০৮। জমির পরিমান- তিন একর আট শতক তিন অযুতাংশ।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সরকারি নিয়মে ডিসিআর ফি পরিশোধ করে প্রস্তাবিত খতিয়ান অনুযায়ী হোল্ডিং খুলে অনলাইন দাখিলা সংগ্রহ করতে গেলে পাঁচ হাজার টাকা আবারও ঘুষ দাবি করে ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা। তার দাবীকৃত ঘুষের টাকা দিতে অসম্মতি জানায় সাকিল। ফলে ক্ষুব্ধ হয়ে নেট নেই বলে হোল্ডিং খুলে দিতে বিভিন্ন টালবাহানা করা হয়। এঅবস্থায় প্রায় ৪ ঘন্টা অফিসে বসিয়ে রেখে অনলাইনে তার হোল্ডিংয়ে দাখিলা সাবমিট করে দেয়া হয়। এসময় তাকে হুমকি দিয়ে বলা হয়, এমন কাজ করবো সারাজীবন পস্তাইবা।
সাকিল আহমেদ বলেন, নামজারি হওয়ার কিছুদিন পরে তার ওয়ারিশগণ হোল্ডিং চেক করতে গিয়ে দেখেন হোল্ডিংয়ে কোন জমি নেই। তার অজান্তে কোন নোটিশ ছাড়াই মাত্র ৪৩ দিনের মাথায় গত ২০ মে তাদের নামজারি বাতিল করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, এসিল্যান্ডের দায়িত্বরত তানোর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নাঈমা খান প্রতিপক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে তার নামজারি বাতিল করেছেন। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ সজীবের যোগসাজসে ও কু-পরামর্শে তাদের নামজারি বাতিল করা হয়।
তিনি আরও বলেন, তাদের আরও তিনটি নামজারি আবেদন শুনানি ছাড়া বাতিল করা হয়। আমরা এই ঘুষখোর দূর্নীতিবাজ তানোর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ সজীবের শাস্তিমূলক অপসারণের জন্য সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
আরেক অভিযোগকারী জিওল গ্রামের রুহুল আমিন বলেন, এই ভূমি অফিসের সহকারী কর্মকর্তা তানভীরের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দায়িত্বে চরম অবহেলা, তদন্তে ইচ্ছাকৃত বিলম্ব, অসদাচরণ, সরকারি নির্দেশ অমান্য, নথি পরিবর্তন, অভিযোগকারীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নিরপেক্ষ ও আকস্মিক তদন্তপূর্বক বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উল্লেখিত দপ্তরে আমিও লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছি। আমরা এই ঘুষখোর দূর্নীতিবাজ ভূমি অফিসের সহকারী কর্মকর্তা তানভীরের শাস্তিমূলক অপসারণ দাবি জানাচ্ছি।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে- শুধু তাদের এমন অভিযোগ নয়, এই ভূমি অফিসের সহকারী কর্মকর্তা তানভীরের বিরুদ্ধে বহু মানুষের হাজারো বিভিন্ন অভিযোগ দীর্ঘদিনের জমিতে আছে। এরপরও কেন তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা, কৈফিয়ত তলব বা শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে না। এনিয়ে তানোরে নানা গুঞ্জন চলছে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছনে, এর পেছনে কি ঊর্ধ্বতন র্কতৃপক্ষরে ভূমিকা রয়েছে, নাকি কোনো প্রভাবশালী মহলের চাপ বা অন্য কোনো কারণ কাজ করছে? যদওি এসব বিষয়ে সংশ্লষ্টি র্কতৃপক্ষরে পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানকি কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এবিষয়ে তানোর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ সজীব বলেন, ইউএনও স্যার মনে হয় ভূলক্রমে ৭১৪৪(৯-১)/২০২৫-২৬ নামজারি বাতিল করেছেন। আচ্ছা ঠিক আছে আমি তাদের নামজারি নষ্ট করেছি, আমিই ঠিক করে দিব। তার এমন বক্তব্যের কলরেকর্ড এ প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষণ রয়েছে।
এব্যাপারে তানোর এসিল্যান্ডের দায়িত্বরত উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নাঈমা খান বলেন, তানোর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মৌখিকভাবে অভিযোগ শুনেছি। এরপরও তার বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে বিধিমতে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।