স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অচল করে দিয়েছে তীব্র গরম ও অনবরত লোডশেডিং। জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলায় দিন কিংবা রাত, কোনো সময়েই মিলছে না স্বস্তি। দফায় দফায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সর্বস্তরের মানুষ। তাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় একটানা এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ উঠে এসেছে। বিদ্যুৎ এলেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে না।
তীব্র এই গরমে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থী, চিকিৎসাধীন রোগী, কৃষক, ভ্যানচালক, পোলট্রি ও গবাদিপশুর খামারি, ব্যবসায়ীসহ খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। এর ওপর বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সুযোগ নিয়ে সেচ পাম্পের (ডিপ টিউবওয়েল) ট্রান্সফরমারের যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনা ঘটায় উদ্বেগ বাড়ছে কৃষকদের মাঝে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ১৩ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে জয়পুরহাটে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৫ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ভ্যাপসা গরমের সাথে বিদ্যুতের এই লুকোচুরিতে উপজেলার স্বাস্থ্যসেবাতেও বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
ক্ষেতলাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ড. আতিকুর রহমান বলেন, দিনে-রাতে দফায় দফায়, কখনো চার-পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এতে পুরো চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। ভ্যাপসা গরমে ভর্তি থাকা রোগীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে, যা ক্ষেত্রবিশেষে রোগীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে। হাসপাতাল গ্রিডে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে অনুরোধ জানানো হলেও আকস্মিক লোডশেডিংয়ের কারণে চিকিৎসকদের উৎকণ্ঠার মধ্যেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
পড়াশোনা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও এসেছে বড় বাধা। অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নাজমুল হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, পড়ার টেবিলে বসলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। অন্ধকারের পাশাপাশি তীব্র গরমে মনোযোগ তো দূরের কথা, টেবিলেই বসা যায় না। পরীক্ষার সময়েও একই অবস্থা। আর রাতে ঘুম না হওয়ায় শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছি।
ক্ষেতলাল পৌর এলাকার ইটাখোলা বাজারের খামারি জামাল হোসেন জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্যান চালানো যাচ্ছে না। গরমে খামারের গরুগুলো অস্থির হয়ে পড়ায় বারবার গোসল করাতে হচ্ছে।
এদিকে হিমাগারগুলোতে আলু সংরক্ষণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন উৎকণ্ঠা। স্থানীয় মোল্লা হিমাগারের ব্যবস্থাপক জহুরুল ইসলাম জানান, বিদ্যুৎ চলে গেলে হিমাগারের ভেতরের তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠে যায়, যা সংরক্ষিত আলুর গুণগতমানে বড় ক্ষতি করছে। জেনারেটর চালিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে তাদের উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎ অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার তিনটি উপকেন্দ্রের আওতায় মোট ১১টি ফিডার রয়েছে। মোট ৪০ হাজার গ্রাহকের বিপরীতে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৫ থেকে ১৬ মেগাওয়াট। আর সেচ পাম্প বন্ধ থাকলে চাহিদা থাকে প্রায় ১৩ মেগাওয়াট। কিন্তু বিশেষ করে রাতের বেলা চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে মাত্র ৭ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে এলাকাভেদে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে ক্ষেতলাল বিদ্যুৎ অফিসের এজিএম কাজী তৌকির আহমেদ জানান, জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া যায়, আমরা সেটিই উপজেলায় বণ্টন করি। সরবরাহ কমে গেলে লোডশেডিং বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকে না।
পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর পরিচালক মাহমুদুল হাসান চৌধুরী রকেট বলেন, বর্তমানে যে সংকট দেখা দিয়েছে, তা কোনো স্থানীয় সমস্যা নয়; এটি একটি সাময়িক জাতীয় সমস্যা। জাতীয় গ্রিডে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকায় যেটুকু বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে, তা-ই সমানভাবে ভাগ করে বিতরণ করা হচ্ছে।