জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাত বাংলাদেশের অন্যতম প্রাণঘাতী দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছরই বজ্রপাতে শত শত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। জাতীয় দুর্যোগে পরিণত হয়েছে বজ্রপাত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করে প্রাণহানি কমাতে একের পর এক প্রকল্প নিলেও সুফল মিলছে না। অথচ ৪০ লাখ তালগাছ রোপণ, বজ্রনিরোধক দন্ড স্থাপন, আগাম সতর্কবার্তা দেয়ার সেন্সর বসানোসহ সব মিলিয়ে শত শত কোটি টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু ভেস্তে গেছে অধিকাংশ প্রকল্পই। ফলে থামছেই বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল। বর্তমান সরকারও পুরোনো প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতার মধ্যেই নতুন করে উদ্যোগ নিচ্ছে। চলছে হাওরাঞ্চলে সাইরেন স্থাপন, শক্তিশালী টাওয়ার নির্মাণ এবং কৃষকদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা।দুর্যোগ ব্যবস ’াপনা অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, চলতি বছরের জুনের প্রথম তিন সপ্তাহে ৮৫ জন বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছে। আর বছরের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই দুই শতাধিক ছাড়িয়ে যায় মৃতের সংখ্যা। দেশে বছরে গড়ে প্রায় ৩০০ জন বজ্রপাতে মারা যান। যদিও নব্বইয়ের দশকে ওই সংখ্যা গড়ে মাত্র ৩০ জন ছিলো। যদিও ব্রজপাত নিরোধের লক্ষ্যে কাবিখা ও টিআর কর্মসূচির আওতায় সরকার সারাদেশে ৪০ লাখ তালগাছের চারা রোপণের উদ্যোগ নিয়েছিলো। তাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা খরচ হয়। তালগাছ রোপণের যুক্তি ছিল, তালগাছের উচ্চতা ও গঠন বজ্রপাত মাটিতে নামিয়ে আনতে সহায়ক হবে। কিন্তু দুই বছর না যেতেই দেখা যায় অধিকাংশ চারা নষ্ট হয়ে যায়। আর কোথাও গবাদি পশু খেয়ে ফেলেছে, কোথাও পরিচর্যার অভাবে মরে গেছে। আবার কোথাও চারা না লাগিয়েই টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, বিগত ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে রাজশাহীতে ১৪ লাখ তালবীজ রোপণ করা হয়েছিলো। তাতে দুই কোটি ২০ লাখ টাকা খরচ হলেও বর্তমানে সড়কের পাশে ওই গাছের অস্তিত্ব নেই। আর রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় ছয় কোটিরও বেশি টাকা খরচ করে ২ লাখের বেশি তালগাছের চারা ও বীজ রোপণ করা হয়েছিলো। কিন্তু তার ৯৫ শতাংশ গাছই টেকেনি। তাছাড়া সুনামগঞ্জে ২০১৮ সালে এক লাখ এবং পরে আরো দুই হাজার তালগাছ লাগানোর কথা বলা হলেও মাঠ পর্যায়ে সেগুলোর অস্তিত্ব মেলেনি। তাছাড়া নেত্রকোনা, গাইবান্ধা, নেত্রকোনা, ঠাকুরগাঁওসহ বিভিন্ন জেলায় একই চিত্র মিলেছে।
সূত্র আরো জানায়, বজ্রপাত নিয়ন্ত্রণে তালগাছ প্রকল্প ব্যর্থ হলে বজ্রনিরোধক দন্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫টি বজ্রপাতপ্রবণ জেলায় ৩৩৬টি বজ্রনিরোধক দণ্ড বসাতে সাড়ে ১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে ওসব দন্ডের বড় অংশই ঝুঁকিপূর্ণ কৃষিজমি বা হাওরে না বসিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, বাজারে বসানো হয়েছে। আর অনেক জায়গায় ওই দন্ড কোথায় আছে স্থানীয় লোকজনই জানে না। তাছাড়া যেসব বজ্রনিরোধক দন্ড স্থাপন করা হয়েছিলো তার বেশির ভাগেরই রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। ফলে বগুড়ায় ২০২১ সালে প্রায় এক কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে ২১টি যন্ত্র বসানো হলেও তার ১৯টিই অকেজো হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও বজ্রনিরোধক দন্ডের যন্ত্রাংশ কিছুদিনের মধ্যেই চুরি হয়ে যায়। তাছাড়া বজ্রপাতের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার জন্য ২০১৮ সালে ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তর দেশের ৮টি স্থানে ‘লাইটনিং ডিটেকশন সেন্সর’ স্থাপন করে। ওই সেন্সরগুলো বজ্রপাতের ১০ থেকে ৩০ মিনিট আগে সতর্কবার্তা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সংযোগ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন অধিকাংশ সেন্সর কার্যত অকার্যকর।
এদিকে বজ্রবিরোধ প্রকল্প প্রসঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুস ছোবহান জানান, আগে এক হাজার ৩০০ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছিল। কমিশনের পরামর্শে তা ছোট পরিসরে পুনর্গঠন করা হচ্ছে।