হাওরে বজ্রনিরোধক দণ্ড

পরিকল্পনার ঘাটতি, বাড়ছে প্রাণহানি

এফএনএস
| আপডেট: ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ০৮:২০ পিএম | প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ০৮:২০ পিএম
পরিকল্পনার ঘাটতি, বাড়ছে প্রাণহানি

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর মার্চ থেকে জুন-এই সময়ে কৃষক, জেলে ও দিনমজুরসহ অসংখ্য মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারান। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছরে এ অঞ্চলে বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। অথচ এই ঝুঁকি মোকাবিলায় নেওয়া সরকারি উদ্যোগও কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। কয়েক বছর আগে বজ্রপাতের ক্ষতি কমাতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হলেও বাস্তবে সেগুলোর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ। প্রকাশিত খবরাখবর থেকে জানা গেছে, এসব দণ্ড মূলত ইউনিয়ন পরিষদ, ভূমি অফিস কিংবা অন্যান্য সরকারি ভবনে বসানো হয়েছে, যেখানে মানুষের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। অথচ হাওরের উন্মুক্ত মাঠ, যেখানে প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে হাজারো মানুষ কাজ করেন, সেখানে এ ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, স্থাপিত অনেক দণ্ডই বর্তমানে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, প্রযুক্তিগত ত্রুটি এবং তদারকির ঘাটতি-সব মিলিয়ে প্রকল্পটির কার্যকারিতা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। ফলে যে উদ্দেশ্যে এই বিনিয়োগ, তা বাস্তবায়িত হয়নি; বরং জনমনে বাড়ছে অনাস্থা ও আতঙ্ক। এখানে শুধু অবকাঠামোগত দুর্বলতা নয়, পরিকল্পনার ঘাটতিও স্পষ্ট। বজ্রপাতের ঝুঁকি যেখানে সবচেয়ে বেশি, সেখানে সুরক্ষা ব্যবস্থা না রেখে প্রশাসনিক ভবনে সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত প্রশ্ন তোলে প্রকল্প প্রণয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, কোথাও কোথাও ব্যক্তিস্বার্থ কিংবা প্রশাসনিক সুবিধাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে-যা একটি জননিরাপত্তা প্রকল্পের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের তীব্রতা ও ঘনত্ব বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন। হাওরাঞ্চলে গাছপালা কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিক সুরক্ষাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে ঝুঁকি আরও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব মানেই প্রাণহানির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া। সমাধানের জন্য জরুরি কিছু দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন। বজ্রনিরোধক দণ্ডগুলো দ্রুত সংস্কার ও কার্যকর করতে হবে এবং সেগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হাওর এলাকায় পুনর্বিন্যাস করা দরকার। এছড়াও উন্মুক্ত মাঠে কাজ করা মানুষের জন্য ছোট ছোট আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ জরুরি। এবং স্থানীয় পর্যায়ে আবহাওয়া সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার করতে একটি আধুনিক আবহাওয়া কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও এর ক্ষতি কমানো সম্ভব পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে। সুনামগঞ্জের হাওরে স্থাপিত অকেজো বজ্রনিরোধক দণ্ডগুলো আমাদের সেই বাস্তবতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়-যেখানে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ফাঁকফোকর মানুষের জীবনের জন্য মারাত্মক হয়ে উঠছে। এখন প্রয়োজন দায়বদ্ধতা ও কার্যকর পদক্ষেপ।