দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আজ এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে কার্যকর কোনো অগ্রগতি না থাকায় দেশ ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ফলে অর্থনৈতিক চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি শিল্প, কৃষি ও বিদ্যুৎ খাতেও এর বহুমাত্রিক প্রভাব পড়ছে। সরকারি সূত্র ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের পর থেকে নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর ও ধারাবাহিক উদ্যোগের ঘাটতি ছিল। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)-এর সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ ও আধুনিকায়ন হয়নি। ফলে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ক্রমেই হ্রাস পেয়েছে, আর ঘাটতি পূরণে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বর্তমানে দেশের দৈনিক গ্যাস চাহিদা যেখানে প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, সেখানে সরবরাহ ২৬৫ কোটি ঘনফুটের মতো। প্রতিদিন গড়ে ১১৫ কোটি ঘনফুট ঘাটতি শিল্প, বাসাবাড়ি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে সংকট তৈরি করছে। এই ঘাটতি পূরণে আমদানিনির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো অনুসন্ধান না করার কারণে দেশ একটি বড় সুযোগ হারিয়েছে। গত এক দশকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে এলএনজি আমদানি করতে হলেও সেই অর্থ দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা যায়নি। এতে স্বল্পমেয়াদে চাহিদা মেটানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাত আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শিল্প খাতে এর প্রভাব সবচেয়ে দৃশ্যমান। গ্যাস সংকটে অনেক কারখানা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে, উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগে অনীহা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষিখাতে সেচ ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে অনিশ্চয়তা সামগ্রিক অর্থনীতিকে চাপে ফেলছে। অন্যদিকে পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদারের কথা বলা হলেও বাস্তব অগ্রগতি এখনো সীমিত। অফশোর ও অনশোর ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর ফল দিতে সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানি খাতে টেকসই সমাধানের জন্য এখনই সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। দেশীয় অনুসন্ধান বাড়ানো, বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি, গভীর ও অগভীর সমুদ্রে দ্রুত অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করা এবং জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়ন-এসব পদক্ষেপ ছাড়া আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা এখন জাতীয় অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে নীতি-নির্ধারকদের এখনই কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, নতুবা ভবিষ্যতে এর ব্যয় বহন করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।