আইএমএফ ঋণচুক্তি

শর্তপূরণ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার কঠিন সমীকরণ

এফএনএস | প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম
শর্তপূরণ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার কঠিন সমীকরণ

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর ঋণচুক্তিকে কেন্দ্র করে বর্তমান সরকারের সামনে এক জটিল নীতিগত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। একদিকে কঠোর শর্তপূরণ করলে মূল্যস্ফীতি ও জনজীবনের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা, অন্যদিকে শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, বিনিময় হার অস্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক আস্থাহানির ঝুঁকি-দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে অর্থনীতি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ পরিস্থিতি হঠাৎ তৈরি হয়নি; বরং পূর্ববর্তী সময়ের নীতিগত দুর্বলতা ও কাঠামোগত সমস্যার ধারাবাহিক ফল। উচ্চ ঋণনির্ভরতা, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব আহরণে ঘাটতি এবং ভর্তুকিনির্ভর অর্থনীতি-সব মিলিয়ে একটি চাপের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বর্তমান বাস্তবতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা। আইএমএফের ঋণচুক্তির শর্তগুলো মূলত কাঠামোগত সংস্কারের দিকে নির্দেশ করে-ভর্তুকি হ্রাস, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার। এসব শর্ত অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্বল্পমেয়াদে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় কম নয়। বিশেষ করে জ্বালানি ও বিদ্যুতের ভর্তুকি কমানো সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর। বর্তমানে রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ঘাটতি সরকারের নীতিনির্ধারণকে আরও কঠিন করে তুলেছে। কর-জিডিপি অনুপাত কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না পৌঁছানোয় বাজেট বাস্তবায়নে চাপ বাড়ছে এবং ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, যেমন ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক সহায়তা উদ্যোগ, সরকারের ব্যয় বাড়ালেও তা রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। একদিকে আইএমএফের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন, কারণ এটি কেবল ঋণের উৎস নয়, বরং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্যও একটি মানদণ্ড। অন্যদিকে দেশের বাস্তবতায় সব শর্ত অন্ধভাবে বাস্তবায়ন করলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই প্রয়োজন দক্ষ ও কৌশলগত আলোচনার মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত পথ নির্ধারণ করা। ভর্তুকি হ্রাসের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া, করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা বৃদ্ধি করা, কর ফাঁকি রোধ করা এবং ব্যাংকিং খাতে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন-এসব উদ্যোগ পরিস্থিতি সামাল দিতে সহায়ক হতে পারে। আইএমএফের ঋণচুক্তি শুধু অর্থায়নের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কারের একটি সুযোগও। তবে সেই সংস্কার হতে হবে দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নচেৎ স্বল্পমেয়াদী চাপ দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।